যুক্তরাজ্যে জব্দ থাকা প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার দেশে ফেরানোর সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। অর্থের অঙ্ক ৩০৬ কোটি টাকার বেশি। একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যে তথ্য ও আইনি ভিত্তি চেয়েছিল, তা সময়মতো দিতে পারেনি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ফলে অর্থ ছাড় পেয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যায়। বিএফআইইউ প্রতিষ্ঠার পর বিদেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ফেরানোর এটিই ছিল সবচেয়ে বাস্তব সুযোগ।
অর্থটি ছিল ইস্টার্ন ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও জাহাজভাঙা শিল্পের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর নামে। লন্ডনে ইউবিএস এজি ব্যাংকের একটি হিসাবে থাকা এই অর্থ সাময়িকভাবে জব্দ করেছিল যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নথি, ইমেইল ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথি বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানটি করেছে টাইমস।
এই অর্থ নিয়ে ঢাকায় প্রথম আনুষ্ঠানিক গোয়েন্দা বার্তা আসে ১০ ফেব্রুয়ারি। এনসিএ তার প্রতিবেদন তৈরি করেছিল আগের দিন। বার্তায় শওকতের নামে ইউবিএসের লন্ডন হিসাবের তথ্য ছিল। সঙ্গে জানতে চাওয়া হয়, বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত চলছে কি না এবং ঢাকা আরও সহায়তা চায় কি না।
শওকত অবশ্য বিএফআইইউর অচেনা ছিলেন না। ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি মেঘনা ব্যাংকের সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংস্থাটি তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের লেনদেন খতিয়ে দেখা শুরু করে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই তাঁর দেশীয় ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। কিন্তু ২৯ আগস্টের পর সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ যুক্তরাজ্যকে জানায়, শওকত তাদের নজরদারির আওতায় থাকা ব্যক্তি এবং অর্থ জব্দ রাখার অনুরোধ করে।
তখন এনসিএ প্রশ্ন তোলে, বাংলাদেশে তাঁর হিসাব কেন আর জব্দ নেই এবং কোনো সম্পদ কেন আটক করা হয়নি। প্রচলিত আইনে বিএফআইইউ চাইলে হিসাব আরও পাঁচ মাস জব্দ রাখতে পারত। এর বেশি সময় দরকার হলে সিআইডি বা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদালতের দ্বারস্থ হতে পারত।
ব্রিটিশ সংস্থা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, অর্থ জব্দ রাখতে কী কী তথ্য লাগবে। কোন সংস্থা শওকতের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, কী অপরাধের সন্দেহ, তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং ওই অপরাধের সঙ্গে ২৫ মিলিয়ন ডলারের যোগসূত্র কী, এসব জানতে চাওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া দুই মাসের মধ্যে কার্যকর পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ (এমএলএ) পাঠানো সম্ভব কি না, তাও জানতে চায় এনসিএ।
২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে ঢাকায় এল কড়া সতর্কবার্তা, ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’। এনসিএ জানায়, বাংলাদেশের দেওয়া তথ্য দিয়ে আর বেশিদিন অর্থ জব্দ রাখা কঠিন হবে। ওই দিন দুপুর ১টা ১৩ মিনিটে ঢাকার জবাব গেল। তাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতির বড় ঘাটতি ধরা পড়ে।
বিএফআইইউ জানায়, শওকতের দেশীয় হিসাব জব্দ হয়েছিল ২০২৫ সালের ১ জুলাই, তবে ২৯ আগস্টের পর তা বাড়ানো হয়নি। আরও জানায়, এনবিআর, সিআইডি ও দুদক আলাদাভাবে তাঁর বিষয়ে কাজ করলেও কেউ তাঁর কোনো সম্পদ আটক করেনি। দুই দিন পর, ২৭ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাজ্য জানিয়ে দেয়, তাদের আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র এ বিষয়ে আর এগোবে না। ভবিষ্যতে আরও জোরালো অভিযোগ দাঁড় করানো গেলে বাংলাদেশ আবার যোগাযোগ করতে পারবে, এমন কথাও বলা হয়। ব্যাংক ও গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, এর অল্প পরেই অর্থ ছাড় পায় এবং আমিরাতে সরে যায়।
যুক্তরাজ্য পিছিয়ে যাওয়ার পরই বিএফআইইউর তৎপরতা বাড়ে। ১০ মার্চ সংস্থাটি জানায়, শওকতের বিরুদ্ধে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের তদন্ত চলছে। অভিযোগ হলো, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন কর-স্বর্গে নিবন্ধিত ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে পুরোনো জাহাজ আমদানির আড়ালে অর্থ সরানো হয়েছে। তখনো তারা অর্থ জব্দ রাখার অনুরোধ করে।
১৫ মার্চ এনবিআর শওকতের ওপর ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকার কর ও জরিমানা আরোপ করে। তখনকার বিনিময় হারে যা ২৫ মিলিয়ন ডলারের সমান। এর দুই দিন পর বিএফআইইউ এই জরিমানাকে ওই অর্থের ওপর বাংলাদেশের দাবির ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাজ্যের সামনে তুলে ধরে। অর্থ জব্দ রাখা ও দেশে ফেরানোর জন্য সহায়তাও চায়। একই সঙ্গে জানায়, বিদেশে অর্থ পাঠানো বা বিনিয়োগের অনুমতি না থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের তদন্তও শুরু হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ঠিক এই ধরনের আইনি ভিত্তি ও অপরাধের যোগসূত্রই চেয়েছিল যুক্তরাজ্য। ঢাকা তা দিল তখন, যখন অর্থ ততক্ষণে নাগালের বাইরে।
বিএফআইইউর তিনজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোপন প্রতিবেদন, ইমেইল ও অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনা করেন। তাঁদের মূল্যায়ন প্রায় একই। তাঁদের মতে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা প্রতিবেদন অন্য সংস্থাকে দেওয়া বা আদালতে উপস্থাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাংলাদেশের নিজস্ব তদন্ত বা দেশীয় আইনি পদক্ষেপে বাধা ছিল না।
তাঁরা বলেন, বাংলাদেশ শওকতের হিসাব আবার জব্দ করতে পারত। সিআইডি বা দুদকের তদন্ত এগিয়ে নিতে পারত এবং সম্পদ আটকের জন্য আদালতের আদেশ চাইতে পারত। এতে যুক্তরাজ্যের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হতো, এমএলএ অনুরোধের ভিত্তিও তৈরি হতো। ব্যারিস্টার রিজওয়ান সিদ্দিক নথিগুলো দেখে বলেন, বাংলাদেশের সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখলে এই অর্থ জব্দ রাখার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি ছোট নয়। সরকারের শ্বেতপত্র অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় সাত গুণ। এই অর্থ ফেরানোর দায়িত্ব বিএফআইইউর নেতৃত্বাধীন চোরাচালান ও পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার টাস্কফোর্সের। এই বাস্তবতায় একটি হাতের কাছের সুযোগ হারানো তাই বড় প্রশ্ন তুলছে।
টাইমসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, শওকতের মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন বিএফআইইউর প্রধান ইকতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন এবং অপারেশনস অ্যানালাইসিস শাখার অতিরিক্ত পরিচালক কামরুল হাসান আজাদ। তাঁদের নির্দেশে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইমেইল আদান-প্রদান করতেন নীতি শাখার উপপরিচালক ফুয়ারা খাতুন। ২৫ ফেব্রুয়ারির সেই সংকটময় চার ঘণ্টার সিদ্ধান্তেও দুজনের সম্পৃক্ততা ছিল বলে নথিতে দেখা যায়।
আজাদ আগে শওকতের বিরুদ্ধে বিএফআইইউর অনুসন্ধান পরিচালনা করেছিলেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তা শেষ হলেও প্রতিবেদনটি সিআইডি বা দুদকে পাঠানো হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পায়নি টাইমস। প্রতিবেদনে আরও দুটি তথ্য ছিল না। একটি হলো শওকতের বিনিয়োগের মাধ্যমে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের পাসপোর্ট পাওয়া, অন্যটি সিঙ্গাপুরে বিলাসবহুল সম্পত্তির মালিকানা। অথচ এ-সংক্রান্ত নথি অনুসন্ধানের সময়ই আজাদের কাছে পৌঁছেছিল। এসব কারণে মামুন ও আজাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাঁদের কেউ শওকতের কাছ থেকে কোনো সুবিধা নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি টাইমস।
অনুসন্ধানে আরও একটি অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোন হিসাব জব্দ হচ্ছে, সেই তথ্য বিএফআইইউপ্রধানের ভাগনে শোয়েব মো. মুনতাসির মোর্শেদের কাছে পৌঁছাচ্ছিল। তিনি হিসাব জব্দ হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক ‘প্যাকেজ’ প্রস্তাব করতেন।
প্রতিবেদকের অনুরোধে দুজন ব্যবসায়ী মুনতাসিরের সঙ্গে কথা বলে তা রেকর্ড করেন। টাইমস সেই রেকর্ডিং যাচাই করেছে বলে জানিয়েছে। রেকর্ডিংয়ে মুনতাসিরকে মামুনের নাম উল্লেখ করে অগ্রিম ২ কোটি থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা চাইতে শোনা যায়। সঙ্গে হিসাব থেকে অর্থ ছাড়ের পর তার এক-চতুর্থাংশ দাবি করা হয়। অগ্রিম দিলে বিএফআইইউপ্রধানের সঙ্গে একান্তে বৈঠকের ব্যবস্থার প্রস্তাবও দেন তিনি। অগ্রিম ছাড়া বৈঠক করাতে রাজি না হওয়ায় অনুসন্ধান আর এগোনো যায়নি।
হোয়াটসঅ্যাপে মন্তব্য চাইলে মামুন অভিযোগের প্রমাণ দেখতে চান। উৎসের নিরাপত্তার কারণে অডিও দেওয়া সম্ভব নয় জানালে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। প্রশ্ন পাঠানোর এক মিনিটের মধ্যে মুনতাসির প্রতিবেদককে ফোন করেন। প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও রেকর্ডিংয়ের কথা জানার পর তিনি বিষয়টি ‘নরমভাবে দেখার’ অনুরোধ করেন।
সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেছেন, বিএফআইইউর ভেতরে একটি ‘সিন্ডিকেট’ আছে। কোন তথ্য কোথায় যাবে, কোন মামলা কতদূর এগোবে এবং বিদেশি সংস্থাকে কী জবাব দেওয়া হবে, তা তারাই নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ। একটি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও এমন উদ্বেগের উল্লেখ আছে। তাতে দেখা যায়, আজাদ ছাড়াও এই গোষ্ঠীতে আছেন মনিটরিং শাখা-১-এর একজন অতিরিক্ত পরিচালক এবং নীতি শাখায় ১২ বছর কাটানো একজন যুগ্ম পরিচালক।
চিহ্নিত অন্যদের অনেকেও দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটিতে আছেন, যদিও নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছরের বেশি কেউ থাকতে পারেন না। বিএফআইইউর ৭৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত আটজন পাঁচ থেকে ১২ বছর ধরে সেখানে আছেন। টাইমস আরও জানায়, শওকতের মামলা ছাড়াও ডজনখানেক মামলার তদন্ত শেষ হলেও চূড়ান্ত আইনি ধাপে পৌঁছায়নি। অর্থ পাচার বা দুর্নীতির অভিযোগে ব্যবস্থার জন্য সেগুলোর প্রতিবেদন সিআইডি বা দুদকে পাঠানো হয়নি।
এর আগেও বিএফআইইউর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। মামুন যাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, তাঁকে আর্থিক ও নৈতিক অসদাচরণের কারণে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাঁর আগের প্রধান ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আর্থিক অপরাধের অভিযোগে কারাগারে আছেন। মামুন অবশ্য বিএফআইইউর ভেতরে কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই কর্মকর্তারাই করেন, তাই তাঁদের সরানোর সুযোগ নেই।
এনসিএর গোয়েন্দা প্রতিবেদন অন্য কাউকে দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবু মামলার নথি এনবিআরের হাতে পৌঁছেছে। কীভাবে, সে বিষয়ে মামুন পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ১৩ জুলাই দুপুর ১টা ৪২ মিনিট থেকে ২টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত নিজের দপ্তরে প্রতিবেদকের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ফাইলটি তিনি নিজেই এনবিআরে নিয়ে গেছেন। পরে টাইমস এনবিআর থেকে এনসিএ, যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট ও বিএফআইইউর মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া ইমেইলের অনুলিপি সংগ্রহ করে। কিন্তু ৩ আগস্ট বিকেল ২টা ৩০ মিনিটে তৃতীয় আলোচনায় তিনি বলেন, তিনি নথি কর প্রশাসনকে পাঠাননি।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন ওঠে। এনবিআরের সঙ্গে তথ্য ভাগ করা গেলে সিআইডি বা দুদকের সঙ্গে কেন হলো না? এনবিআর ওই তথ্য ব্যবহার করে কর ও জরিমানা আরোপ করেছে। অথচ সিআইডি বা দুদকের তদন্তে অর্থ পাচার বা দুর্নীতির যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। তখন ফৌজদারি প্রক্রিয়ায় আদালতের আদেশে সম্পদ আটকের পথও খুলত।
এমন বিরল সুযোগ কেন হারাল বাংলাদেশ, এ প্রশ্নে মামুন বিষয়টিকে সেভাবে দেখতে রাজি নন। তিনি বলেন, অর্থটি তাঁরা হারাননি। এনবিআর জরিমানা আরোপ করায় সমপরিমাণ অর্থ নিশ্চিত হয়েছে। অর্থ ফিরে না এলেও জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে। আইনি পদক্ষেপ সীমিত হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার কথা বলেন। তাঁর দাবি, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দেওয়ায় এই গোয়েন্দা নথি কোথাও দেওয়া যায়নি এবং তাঁরা বারবার অনুমতি চেয়েও পাননি।
প্রথমত, পুরো ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে সময়ের হিসাব। যুক্তরাজ্য যে তথ্য চেয়েছিল, বাংলাদেশ তা দিয়েছে অর্থ ছাড় পাওয়ার পর। দেশীয় হিসাব জব্দের মেয়াদ বাড়ানো, সিআইডি বা দুদকের মাধ্যমে আদালতে যাওয়া এবং সম্পদ আটক, এই তিনটি পদক্ষেপ আগে নিলে ২৫ ফেব্রুয়ারির জবাব অনেক শক্ত হতো।
দ্বিতীয়ত, জরিমানা আর অর্থ উদ্ধার এক জিনিস নয়। কর বিভাগের আরোপ করা জরিমানা একটি প্রশাসনিক দাবি মাত্র। অর্থ সত্যিই দেশে ফিরতে হলে সেটি আদায় করতে হবে, আর সেই অর্থ এখন বাংলাদেশের নাগালের বাইরে আমিরাতে। ফৌজদারি প্রক্রিয়ায় আদালতের আদেশ থাকলে বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে দাবি অনেক জোরালো হয়।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাও স্পষ্ট। এনবিআর, সিআইডি ও দুদক আলাদাভাবে কাজ করলেও কেউই সম্পদ আটক করেনি। বিএফআইইউর তদন্ত প্রতিবেদন সিআইডি বা দুদকে গেছে, এমন প্রমাণ মেলেনি। ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রস্তুতি গড়ে ওঠেনি।
চতুর্থত, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এসেছে। কর্মকর্তাদের দীর্ঘ মেয়াদ, তদন্ত শেষেও মামলা আটকে থাকা এবং ‘প্যাকেজ’ নিয়ে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এটি একক ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংস্থাটির ওপর দেশ-বিদেশের আস্থাও নড়ে যাবে। উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ এখনো প্রতিবেদনের দাবি। মামুন সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন, মুনতাসিরও প্রথমে অভিযোগ নাকচ করেছেন।
পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা এখানে বড় বিষয়। পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো পুরোপুরি বিদেশি সংস্থার সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে। ঘাটতিপূর্ণ প্রস্তুতি ও দেরিতে সাড়া দেওয়ার নজির ভবিষ্যতে অন্য দেশের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
সবশেষে, যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও জোরালো অভিযোগ দাঁড় করানো গেলে বাংলাদেশ আবার যোগাযোগ করতে পারবে। তাই আইনি লড়াই এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। এখন দরকার দ্রুত ফৌজদারি তদন্ত, সম্পদ আটকের আদালতি প্রক্রিয়া এবং কার্যকর এমএলএ অনুরোধ। সেই প্রস্তুতি নিতে না পারলে ভবিষ্যতের সুযোগও একইভাবে হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

