বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ইতিবাচক গতি ধরে রেখেছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৯ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৮৭ কোটি ডলারের বেশি অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১৮৭ কোটি ডলার বা ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এর আগের বছর ২০২৫ সালের একই সময়ে, অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছিল ১৮৬ কোটি ডলার। ফলে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী আয়ে প্রায় দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
যদিও মাসিক হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার খুব বেশি নয়, তবে সামগ্রিক অর্থবছরের চিত্রে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখ পর্যন্ত দেশের মোট প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ৭৭০ কোটি ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে এসেছে ৭ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়। গত অর্থবছরের একই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৬ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ ডলারের চাহিদা, আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের চাপ সামাল দিতে প্রবাসী আয় অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত ও স্থিতিশীল প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায় এবং অর্থনীতিতে ভারসাম্য রাখতে সহায়তা করে।
সেপ্টেম্বরের ১৭ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত মাত্র তিন দিনে দেশে এসেছে প্রায় ১৩ কোটি ডলার প্রবাসী আয়। এই প্রবাহ দেখাচ্ছে যে মাসের শেষ ভাগেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী করে না, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের মাধ্যমে লাখো পরিবার তাদের দৈনন্দিন ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বিনিয়োগের প্রয়োজন মেটায়। একই সঙ্গে দেশের ভোগব্যয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই প্রবাসী আয়ে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি ডলারের সরবরাহ বাড়াতে এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুযোগ আরও সহজ করা, প্রবাসীদের জন্য আর্থিক সেবার মান উন্নত করা এবং বিদেশে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান বহুদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, শিল্প ও রপ্তানি খাতের পাশাপাশি প্রবাসী আয় দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। চলতি অর্থবছরের শুরুতে প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তাই দেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে। তবে এই গতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শ্রমবাজারের সুযোগ এবং দেশের নীতিগত ব্যবস্থাপনার ওপর।

