বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগের কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
এফএওর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা পরিমাপক ব্যবস্থার আওতায় তৃতীয় ধাপ বা সংকট পর্যায়ে রাখা হয়েছে। এই পর্যায়ে থাকা মানুষেরা প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করতে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন এবং তাদের পুষ্টি ও জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক এই শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, সংকট পর্যায় এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যেখানে অনেক পরিবার নিয়মিত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হিমশিম খায় এবং জরুরি সহায়তার প্রয়োজন দেখা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়কালে খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা চলতি বছরের মে থেকে আগস্ট সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। ওই সময়ে আনুমানিক ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ একই ধরনের ঝুঁকিতে ছিলেন।
এফএওর হিসাব অনুযায়ী, এই ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ আরও গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। তাদের অবস্থা আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসের চতুর্থ ধাপ বা জরুরি পর্যায়ের খাদ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
খাদ্য পরিস্থিতির অবনতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে এফএও। সংস্থাটি জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও জ্বালানি তেলের উচ্চ ব্যয় এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে অনেক পরিবারের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপের কারণে বাজারে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। একই সঙ্গে দেশের কিছু এলাকায় বন্যার কারণে কৃষি, মাছ ধরা এবং অন্যান্য জীবিকার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছায়, যা ২০১১-১২ অর্থবছরের পর সর্বোচ্চ ছিল।
তবে ২০২৬ সালের আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্য উৎপাদন মোটের ওপর ভালো থাকলেও মানুষের প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। মানুষের আয়, বাজারমূল্য, কর্মসংস্থান এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এফএও জানিয়েছে, দেশের কয়েকটি এলাকায় খাদ্য পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান এবং কক্সবাজারে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক হতে পারে।
এ ছাড়া গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং সুনামগঞ্জের মতো জেলাগুলোতেও তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অঞ্চলের অনেক মানুষ কৃষি, মাছ ধরা, দিনমজুরি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় বা বাজারমূল্যের অস্থিরতা সরাসরি তাদের খাদ্য সংগ্রহের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।
কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাসরত প্রায় ১২ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এফএও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়কালে এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে পারেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থায়নে ঘাটতি এবং সীমিত জীবিকার সুযোগ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, দেশের সামগ্রিক ধান উৎপাদনের পূর্বাভাস তুলনামূলক ইতিবাচক। এফএও জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে মোট ধান উৎপাদন প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ টন হতে পারে, যা গত চার বছরের গড় উৎপাদন ৫ কোটি ৯৫ লাখ টনের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি।
২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে আনুমানিক ৩ কোটি ১৯ লাখ টন ধান। দেশের মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে এই মৌসুম থেকে। উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছে এফএও।
এ ছাড়া মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যার কারণে ক্ষতি হলেও আউশ ধানের উৎপাদন জুলাইয়ে শেষ হয়েছে প্রায় ৪১ লাখ টনে।
বর্তমানে মাঠে থাকা আমন ধানের উৎপাদন প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ কোটি ৫৯ লাখ টন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধান উৎপাদন বাড়ার কারণে দেশের চাল আমদানির প্রয়োজনও কমে আসবে বলে জানিয়েছে এফএও। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার বছরে বাংলাদেশের চাল আমদানি কমে ৮ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। ২০২৫ সালে চাল আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ লাখ টন।
বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতির বর্তমান চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী খাবার নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের খাদ্য সরবরাহ শক্তিশালী করে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, আয় কমে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব অনেক পরিবারকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
২০২৬ সালের শেষ চার মাসের জন্য এফএওর এই পূর্বাভাস বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

