রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলায় গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রোববার গভীর রাতে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলাটি করেন। এতে গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গাজী নজরুল ও মাকসুদা গ্রেপ্তার হলেও ওবায়দুর পলাতক।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান সোমবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ প্রথমে তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানালেও পরে তথ্য সংশোধন করে জানায়, গ্রেপ্তার হয়েছেন দুজন।
ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে মরদেহ
রোববার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ফ্ল্যাটটি গাজী নজরুলের নামে বরাদ্দ এবং সেখানে তাঁর দুই স্ত্রীই থাকতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কক্ষের দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মরিয়মকে পাওয়া যায়। পরে শেরেবাংলা নগর থানা, গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআইয়ের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত সংগ্রহ করেন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ এখনো ঘটনাটিকে চূড়ান্তভাবে আত্মহত্যা বা অন্য কোনো ধরনের মৃত্যু হিসেবে ঘোষণা করেনি। তেজগাঁও বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর পরিষ্কার হবে।
মামলায় নির্যাতনের অভিযোগ
মামলার এজাহার অনুযায়ী, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা গ্রামের মুদিদোকানি এস এম মাসুম বিল্লাহর বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গত জুনে গাজী নজরুলের বিয়ে হয়।
বিয়ের পর মরিয়ম ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদার সঙ্গে থাকতেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে ফোনে পরিবারের সদস্যদের এসব বিষয়ে জানিয়েছিলেন বলেও তাঁর বাবা অভিযোগ করেছেন।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান এই বিয়েতে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন। বাদীর দাবি, পরবর্তী সময়ে স্বামী, প্রথম স্ত্রী ও অন্য আসামির আচরণ ও চাপের কারণে মরিয়ম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এগুলো মামলার অভিযোগ; আদালতে এখনো এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
বিছানায় পাওয়া চিরকুট নিয়ে তদন্ত
মামলার তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে গাজী নজরুল ফোন করে মরিয়মের বাবাকে দ্রুত ন্যাম ভবনে যেতে বলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে মানুষের ভিড় দেখতে পান এবং পরে জানতে পারেন মরিয়ম একটি কক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছেন।
কক্ষের বিছানা থেকে হাতে লেখা একটি চিরকুটও উদ্ধার করেছে পুলিশ। এটিকে প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য ‘সুইসাইড নোট’ হিসেবে দেখা হলেও সেটি মরিয়মের নিজের লেখা কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করিম বলেছেন, চিরকুটটি মরিয়মের হতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। তবে হাতের লেখা ও অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করে সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
দুই আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হবে কি না
গ্রেপ্তার গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে কি না, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিসি ইবনে মিজান।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে গাজী নজরুল ও অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখন তদন্তাধীন এবং আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের দোষী বলা যাবে না।
দুই মাস আগেই শুরু হয়েছিল বিতর্ক
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা–৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে গাজী নজরুল জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন। তিনি দাবি করেছিলেন, ১৭ জুন তাদের বিয়ে হয়েছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এ ঘটনার প্রায় দুই মাস পর একই ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। এখন ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, উদ্ধার করা চিরকুট এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও মামলায় আনা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ হবে।

