পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ১ হাজার ৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পের চুক্তির প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের দাবি, নকশা ও অ্যালাইনমেন্ট বদলে যাওয়া এবং ব্যয় বাড়ার কারণে তারা ভ্যারিয়েশনের দাবি তুলেছে। এই দাবির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাজ চালানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ভ্যারিয়েশন নিয়ে আলোচনা চললেও কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। তাদের দাবি, ঠিকাদারের আর্থিক সংকটই কাজ থেমে যাওয়ার মূল কারণ।
কচুয়া-বেতাগী-পটুয়াখালী-লোহালিয়া-কালাইয়া সড়কের ১৭তম কিলোমিটারে পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাট এলাকায় ১ হাজার ৬৯০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণ কোরিয়ার সামহোয়ান করপোরেশন ও বাংলাদেশের মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে ৬৪১ কোটি টাকার মূল চুক্তি করা হয়। পরে অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
সেতুটি চালু হলে মির্জাগঞ্জের সঙ্গে পটুয়াখালী সদর ও ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, মির্জাগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী সদরে যাতায়াতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কমতে পারে।
গত ১০ জুলাই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন ও পর্যালোচনা সভায় কাজ বন্ধ থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ওই সভায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভ্যারিয়েশন অনুমোদন না হওয়া এবং আর্থিক সংকটের কথা জানায়।
প্রকল্প পরিচালক তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে আছে। আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ পর্যন্ত কার্যালয় স্থাপনসহ প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ, জমি অধিগ্রহণ এবং সেতুর ভায়াডাক্টের কয়েকটি পিলারের কাজ হয়েছে।
ভ্যারিয়েশনের অনুমোদন না হওয়াকে কাজ বন্ধ রাখার যুক্তি হিসেবে মানছেন না প্রকল্প পরিচালক। তিনি বলেন, ভ্যারিয়েশন নিয়ে ঠিকাদারের দাবি থাকতেই পারে। তা নিষ্পত্তির জন্য চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কাজ বন্ধ রেখে দাবি মীমাংসার অপেক্ষায় থাকার সুযোগ নেই। নকশা অনুমোদিত আছে, তাই কাজ চালু রেখেই দাবি নিষ্পত্তি করতে হবে। কাজ বন্ধ রাখায় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। প্রয়োজনে চুক্তি বাতিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রকল্প পরিচালক।
অন্যদিকে মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর নাসির হোসেন বলেন, দরপত্রে অংশ নেওয়ার পর সেতুর নকশা ও অ্যালাইনমেন্টে বড় পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে নির্মাণসামগ্রীর দাম ও অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। তাই চুক্তি অনুযায়ী তাঁরা ভ্যারিয়েশন দাবি করেছেন।
তাঁর ভাষ্য, চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি বোর্ড (ড্যাব) গঠনের বিধান আছে। তাঁরা নিজেদের প্রতিনিধির নাম দিয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ প্রতিনিধির নাম না দেওয়ায় বোর্ড গঠন হচ্ছে না। অনুমোদন ছাড়া কোটি কোটি টাকার বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে কাজ চালানো সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। ভবিষ্যতে এই আর্থিক দায় কর্তৃপক্ষ নেবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত বলে মন্তব্য করেন মীর নাসির। তাঁর দাবি, তাঁরা কোনো অন্যায্য সুবিধা চাইছেন না। চুক্তি অনুযায়ী বোর্ড গঠন করে দাবি যাচাই করা হোক। দাবি যৌক্তিক হলে তাঁরা পাবেন, না হলে পাবেন না।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যৌথ উদ্যোগের কোরিয়ান অংশীদার সামহোয়ান করপোরেশনের মাঠপর্যায়ে তেমন কার্যকর ভূমিকা নেই। প্রকল্পে তাদের এক-দুজন প্রতিনিধি আছেন, যাঁরা মূলত নথিপত্রে স্বাক্ষর করেন। মাঠপর্যায়ের কাজ মীর আখতারই করছে।
মীর আখতারের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রতিষ্ঠানটির ১৬টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে মহাসড়ক, সেতু, বিমানবন্দর, রেললাইন ও নদী খননসহ যোগাযোগ অবকাঠামোর ১২টি প্রকল্প রয়েছে। এ অবস্থায় হাজার কোটি টাকার পায়রা সেতুর কাজ থেমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

