রোহিঙ্গা সংকটকে একটি গুরুতর মানবিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, কোনো সমস্যার সমাধান সহিংসতার মাধ্যমে সম্ভব নয়। আলোচনা, সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বলেন, রোহিঙ্গারা এমন একটি জনগোষ্ঠী, যারা ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়েছে। তারা নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে, গ্রাম ধ্বংস হয়েছে এবং বাধ্য হয়ে নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এই সংকটের ভয়াবহতা যেমন বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে, তেমনি রোহিঙ্গাদের টিকে থাকার শক্তি ও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, কক্সবাজার সফরের সময় তিনি রোহিঙ্গাদের দৃঢ়তা দেখেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব গত বছর কক্সবাজার সফর করলে এক লাখের বেশি শরণার্থী তার সঙ্গে দেখা করতে জড়ো হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল একটি বার্তা, তারা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চায়।
তার মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি এমন একটি জায়গা যেখানে বিশ্বের দেশগুলো একত্রিত হয়ে নিরাপদ পরিবেশে বড় সংকটগুলোর সমাধানের পথ খুঁজতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ আবারও এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের গুরুত্ব তুলে ধরবেন এবং এর সমাধানে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানাবেন বলে জানানো হয়েছে।
আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আয়োজিত রোহিঙ্গা বিষয়ক একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখনো একটি চলমান সমস্যা। জাতিসংঘের এই বড় সমাবেশে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সংকটের ব্যাপকতা, চ্যালেঞ্জ এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরবে।
বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, সম্মানজনক এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনই এই সংকটের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন এমন এক সময়ে, যখন সংস্থাটির কার্যকারিতা ও ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
গত ৩৫ বছর ধরে বিভিন্ন দায়িত্বে জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত থাকা খলিলুর রহমান তার এক বছরের সভাপতিত্বের মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন সংস্থাটির প্রতি আস্থা পুনর্গঠন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা ছিল একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা ভবিষ্যতের বড় যুদ্ধ প্রতিরোধ করবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে আরেকটি বড় সংঘাত থেকে রক্ষা করা। খলিলুর রহমান বলেন, গত আট দশকে বিশ্ব আরেকটি বৈশ্বিক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়নি, যা জাতিসংঘ ব্যবস্থার একটি বড় অর্জন।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত বন্ধ করা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদকে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে এবং শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের তিনটি মূল স্তম্ভেই আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।
খলিলুর রহমান জানান, জাতিসংঘের মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ শতাংশ মানবাধিকার খাতে ব্যয় হয়। মানবাধিকার রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
তার মতে, সদস্য দেশগুলো এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলেই জাতিসংঘের প্রতি মানুষের আস্থা আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব সভ্যতার জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে এবং মানুষের কাজের গতি বাড়াতে পারে। তবে একই সঙ্গে এর ব্যবহারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
তার মতে, প্রযুক্তির উদ্ভাবন থামানো উচিত নয়। তবে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যাতে প্রযুক্তি মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, ক্ষতির কারণ না হয়।
তিনি বলেন, শুধু সরকার নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি ও ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত সবাইকে এই বিষয়ে দায়িত্ব নিতে হবে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং ব্যবহারকারীদের সবাইকে আলোচনার অংশ হতে হবে, যাতে নিরাপদ ও মানবকল্যাণমূলক প্রযুক্তি ব্যবস্থার পথ তৈরি করা যায়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও ড. খলিলুর রহমান মনে করেন, এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বের সব দেশকে এক জায়গায় নিয়ে আসার ক্ষমতা।
তিনি বলেন, যদি সাধারণ পরিষদের কোনো গুরুত্ব না থাকত, তাহলে বিশ্বের এত রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান প্রতি বছর এখানে আসতেন না।
তার মতে, কূটনীতি সবসময় প্রকাশ্যে পরিচালিত হয় না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এমন একটি পরিবেশে প্রয়োজন হয় যেখানে নেতারা নিরাপদভাবে মতবিনিময় করতে পারেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সেই সুযোগ তৈরি করে।
তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশের প্রতিনিধিত্বকারী এই প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব শেষ করার আগে তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি দেখতে চান ড. খলিলুর রহমান।
তিনি চান, সদস্য দেশগুলো জাতিসংঘের প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাবে, সংস্থাটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর সেবা পৌঁছানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব হস্তান্তরের দিন তিনি দেখতে চান যে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার পথে কিছু বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সংঘাত, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ, এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্ব নতুন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে এনে শান্তি, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা যায়।

