রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয়টি রুটে একক কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। পরিবহনমালিকদের অসহযোগিতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে নতুন বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা কঠিন হয়ে উঠছে। আগামী ১ নভেম্বর কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ঢাকা মহানগর পুলিশ, ঢাকা বাস পরিবহন মালিক সমিতি, পরিবহন শ্রমিক সংগঠন এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি নির্ধারিত রুটে পৃথক পৃথক কোম্পানির বাস চলাচলের পরিবর্তে একটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালিত হবে। এর মাধ্যমে একই রুটে বাসগুলোর মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা কমানো এবং যাত্রীসেবায় সমন্বয় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রথম সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি
এর আগে ২৫ অক্টোবর নতুন ব্যবস্থা চালুর দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত ছয়টি রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসমালিক একটি কোম্পানির অধীনে যুক্ত হতে রাজি না হওয়ায় সেই লক্ষ্য পূরণ করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে বিভিন্ন নিয়ম ও শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
তবে ডিটিসিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১ নভেম্বরের লক্ষ্য পূরণ না হলেও অল্প সময়ের মধ্যে ছয়টি রুটে নতুন ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বাস রুট পুনর্বিন্যাস নিয়ে বৈঠক করার পর থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিবহনমালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক আলোচনা করেছে। এসব বৈঠকের পর পুরোনো বাস সংস্কার ও নতুন করে রং করার কাজে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।
মাত্র দুই-তিন কোম্পানির ইতিবাচক সাড়া
নতুন ব্যবস্থায় অংশ নিতে পরিবহনমালিকদের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাসের ফিটনেস সনদ সংগ্রহ, যানবাহন সংস্কার এবং পরিচালনাসংক্রান্ত শর্ত পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চালকদের বেতনসংক্রান্ত বিষয়গুলোও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এরপরও অধিকাংশ বাসমালিক নতুন উদ্যোগে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মাত্র দুই থেকে তিনটি কোম্পানি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
পরিবহন খাতের একটি সূত্রের দাবি, আগেও বাসব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে অনেক মালিক মনে করছেন, বর্তমান পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত কার্যকর নাও থাকতে পারে। এই ধারণা থেকেই তাঁদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়েছে।
ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে অভিযান
নতুন বাস পরিচালনাব্যবস্থার শর্ত বাস্তবায়ন করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ যৌথ অভিযান শুরু করেছে।
এসব অভিযানে ফিটনেসবিহীন বাস এবং অনুমোদিত রুট পারমিট ছাড়া চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার পরিচালিত একটি যৌথ অভিযানে পাঁচটি কোম্পানির বাস জব্দ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, অবৈধ ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বাস পরিচালনার সুযোগ কমিয়ে পরিবহনমালিকদের নতুন ব্যবস্থায় যুক্ত হতে উৎসাহিত করা।
ডিসেম্বরের মধ্যে ৩২ রুটে চালুর ঘোষণা
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মশিউর রহমান জানিয়েছেন, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা শুধু পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে না। এটি নিয়মিত পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীর মোট ৩২টি রুটে এই ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডিটিসিএ, ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং পরিবহন শ্রমিক প্রতিনিধিরা বাসমালিকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি রুটের জন্য একটি কোম্পানি গঠনের বিষয়েও মালিকদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বয় জরুরি
ঢাকার গণপরিবহনে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানির বাস একই রুটে চলাচল করছে। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটে একক কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনা করা গেলে যানবাহন ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবায় আরও সমন্বয় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে পরিবহনমালিকদের সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাসের ফিটনেস, চালকদের বেতন এবং পরিচালনাব্যবস্থার নিয়মগুলো বাস্তবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে।
প্রথম দফার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফায়ও অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় নতুন বাসব্যবস্থা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত মালিকদের অনীহা কাটিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে ৩২টি রুটে নতুন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

