বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মান, সক্ষমতা ও বসবাসযোগ্যতা মূল্যায়নের একটি আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর অবস্থান আরও পিছিয়েছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে দেখা গেছে, পরিবেশগত সমস্যা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং জীবনমানের সীমাবদ্ধতার কারণে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বড় শহরের অবস্থানের অবনতি হয়েছে।
এই সূচকে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের ১ হাজার শহরকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানবসম্পদ, জীবনমান, পরিবেশ এবং শাসনব্যবস্থা।
বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ঢাকা ২০২৫ সালের ৪৮২তম অবস্থান থেকে নেমে ২০২৬ সালে ৫১৫তম স্থানে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শহরটি ৩৩ ধাপ পিছিয়েছে।
শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য শহরের অবস্থানেও অবনতি দেখা গেছে। রাজশাহী সবচেয়ে বেশি পিছিয়েছে। শহরটি ৬৬ ধাপ নিচে নেমে ৭৭৯তম অবস্থানে এসেছে। চট্টগ্রাম ১৪ ধাপ পিছিয়ে ৭৬৩তম স্থানে রয়েছে।
খুলনা ৮১১তম, সিলেট ৮৩৪তম এবং ময়মনসিংহ ৮৯৫তম অবস্থানে রয়েছে। বগুড়া বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচের দিকে রয়েছে। শহরটি ৩২ ধাপ পিছিয়ে ৯২৬তম অবস্থানে এসেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ১০০ শহরের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। কুমিল্লা একমাত্র শহর, যেটি আগের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং ৮৮৩তম স্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলোর পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পরিবেশগত সংকট। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শহরগুলোর জীবনমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, সূচকে পরিবেশগত দুর্বলতা দেশের বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন।
তিনি বলেন, বায়ু, পানি ও মাটির মান পরিমাপযোগ্য বিষয় এবং এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে নেই। দূষণের সমস্যা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়, দেশের অন্যান্য শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে শহরটির পরিবেশগত পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শিল্প দূষণ, নগর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন শহরের বাসযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তার মতে, শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই একটি শহরের উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। ফ্লাইওভার বা অন্যান্য প্রকল্প তৈরি হলেও যদি পরিবেশ, নাগরিক সেবা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত না হয়, তাহলে শহরের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না।
শহরের উন্নয়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্যকর শাসনব্যবস্থা। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সূচকে বাংলাদেশের আটটি শহরই শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে একই অবস্থান পেয়েছে। কারণ এই সূচকের এই অংশটি জাতীয় পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
শাসনব্যবস্থার সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর অবস্থান ৯০৩তম।
অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, সুশাসনের বিষয়গুলো অনেক সময় সরাসরি দৃশ্যমান হয় না, তবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব স্পষ্ট।
জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন বা সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা নাগরিকদের অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হয়। এসব বিষয় একটি শহরের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নাগরিক সুবিধার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ঢাকা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। অর্থনৈতিক সূচকে ঢাকা বিশ্বের ২৮৬তম শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে।
এই বিভাগে শহরের মোট অর্থনৈতিক আকার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং জনসংখ্যার পরিবর্তনের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের মধ্যে চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক সূচকে ৭০২তম এবং ময়মনসিংহ ৭৩৪তম অবস্থানে রয়েছে।
মানবসম্পদ সূচকেও ঢাকা ভালো করেছে। এই বিভাগে শহরটি ১৭৮তম অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা, ব্যবসার পরিবেশ এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এই সূচকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খুলনা ৫৪১তম এবং রাজশাহী ৫৯৯তম অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে জীবনমানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শহরগুলো তুলনামূলক পিছিয়ে আছে। এই বিভাগে মানুষের স্বাস্থ্য, আর্থিক নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান বিবেচনা করা হয়।
জীবনমান সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে রাজশাহী সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। শহরটি বিশ্ব তালিকায় ৫৪২তম স্থানে রয়েছে। এরপর খুলনা ৬১২তম এবং চট্টগ্রাম ৬৫৩তম অবস্থানে রয়েছে।
এর আগে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্সেও ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় কম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ছিল।
বিশ্বব্যাপী শহরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, সিয়াটল এবং সান ফ্রান্সিসকো।
নিউইয়র্ক ও লন্ডন তাদের বড় অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং শক্তিশালী শ্রমবাজারের কারণে শীর্ষে রয়েছে। অন্যদিকে জীবনমানের ক্ষেত্রে প্যারিস ভালো অবস্থান করেছে।
তালিকার সবচেয়ে নিচের দিকে রয়েছে নাইজেরিয়ার সোকোটো, ভারতের সুলতানপুর, চীনের ওয়েইনান ও গুইগাং এবং হাইতির পোর্ট-অ-প্রিন্স।
দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে দিল্লি সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং বিশ্ব তালিকায় ২৬৮তম অবস্থানে রয়েছে। এরপর বেঙ্গালুরু ৩১১তম, মুম্বাই ৩৩০তম, চেন্নাই ৩৮১তম এবং হায়দরাবাদ ৪২১তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক তালিকায় ঢাকা ১৩তম স্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলোর উন্নয়নে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করলে হবে না। টেকসই নগর উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সুরক্ষা, উন্নত নাগরিক সেবা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঢাকা দেশের অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র হলেও বায়ুদূষণ, যানজট, অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতা শহরটির জীবনমান কমিয়ে দিচ্ছে।
একটি শহরের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু বড় ভবন, রাস্তা বা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মানুষের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ তৈরি করাই একটি আধুনিক শহরের মূল মানদণ্ড।
বাংলাদেশের শহরগুলোকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ ও সুশাসনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক শহর সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

