বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতের সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানবাধিকার সুরক্ষায় যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সাম্প্রতিক কিছু আইনি পরিবর্তনের কারণে তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটি বিশেষভাবে তিনটি আইনের বিষয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। এগুলো হলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের পরিবর্তে গঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন-২০২৬।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি, এসব আইনের কিছু পরিবর্তন দেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংস্থাটি বলছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবাধিকার রক্ষায় নেওয়া কিছু উদ্যোগ নতুন আইনি কাঠামোর কারণে দুর্বল হয়েছে।
বিবৃতিতে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটার ঝুঁকি কমাতে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বাড়াতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে গুমের অভিযোগ প্রতিরোধ, তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে কমিশনের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
তবে এইচআরডব্লিউর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে নতুন আইনি কাঠামোতে কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্ত ক্ষমতা সীমিত হয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কেও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্তির দাবি থাকলেও নতুন আইনের মাধ্যমে কার্যত শুধু নাম পরিবর্তন হয়েছে বলে তারা মনে করছে।
এইচআরডব্লিউ আরও বলেছে, নতুন কাঠামোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলায়িন পিয়ারসন বিবৃতিতে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে তদন্ত ও জবাবদিহিতার আওতার বাইরে রাখার কোনো উদ্যোগ থাকলে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব আইন ও উদ্যোগের বিষয়ে আলাদা ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া থাকলে তা এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা যেতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ এবং সরকারের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। অন্যদিকে সরকারগুলো সাধারণত দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবাধিকার সুরক্ষা, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার কার্যকারিতা—এসব বিষয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

