দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও এলপিজির দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভূমিকা থাকলেও ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা এখনো কমিশনের হাতে নেই। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের কাছেই রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে বিইআরসির ক্ষমতা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে একটি প্রবিধানমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। ওই সময় কমিশনের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও মন্ত্রণালয় থেকে সেই মতামত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বিইআরসির হাতে গেলে গণশুনানি, মূল্য নির্ধারণের যুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সুযোগ তৈরি হতো। তাদের অভিযোগ, এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
বর্তমানে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম সরকার নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইন সংশোধনের পর সরকার এসব জ্বালানি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সরাসরি ক্ষমতা পায়। এরপর ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে এসব পণ্যের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে।
এর আগে জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তবে জ্বালানি খাতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে বিইআরসির ভূমিকা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
বিইআরসি আইনের কাঠামো অনুযায়ী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মূল্য নির্ধারণে কমিশনের ভূমিকা থাকার কথা। তবে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা এখনো কার্যকর হয়নি।
বিইআরসি সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের খুচরা মূল্য নির্ধারণসহ পরিবহন, মজুদ ও বিপণন সংক্রান্ত তিনটি প্রবিধানমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করার কথা ছিল।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালেও বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও আবার মতামত চাওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, তরল জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব নিতে হলে আগে কমিশনের প্রবিধানমালা চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি জানান, কয়েক দফায় মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
তার মতে, তিনটি পৃথক প্রবিধানমালার পরিবর্তে একটি সমন্বিত প্রবিধানমালা তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। সেটিও মতামতের জন্য পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত তা চূড়ান্ত হয়নি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মূল দাবি হলো, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা বাড়ানো।
তাদের মতে, বিইআরসির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ হলে গণশুনানির সুযোগ তৈরি হবে। সেখানে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য হিসাব নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে সরকার ও বিপিসির হিসাবের ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। ভোক্তাদের অভিযোগ, মূল্য নির্ধারণের বিস্তারিত হিসাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সরাসরি জানার সুযোগ সীমিত।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরও এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দাম বাড়ার প্রভাব পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিইআরসির ভূমিকা রয়েছে। তবে এটি সরকারের স্বেচ্ছায় দেওয়া ক্ষমতা নয়; উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর ২০২১ সাল থেকে কমিশন এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বিইআরসির হাতে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিইআরসি আইনের আওতায় পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা কমিশনের থাকার কথা। তবে প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় তা কার্যকর হচ্ছে না।
তার মতে, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ভোক্তার কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ক্যাব উচ্চ আদালতে রিট করেছে এবং আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতে গেলে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে।
বিইআরসির সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতে, প্রবিধানমালা আটকে থাকার পেছনে মূল বিষয় হলো কর্তৃত্বের প্রশ্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিইআরসির হাতে ক্ষমতা গেলে জ্বালানি তেল কেনাবেচা ও মূল্য নির্ধারণের হিসাব আরও বেশি পর্যালোচনার আওতায় আসবে।
তার মতে, মূল্য বাড়ানোর আগে কমিশনের গণশুনানিতে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে হবে—যা বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় ভিন্ন ধরনের জবাবদিহি তৈরি করবে।
জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে বিইআরসির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক মূলত স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির প্রশ্নকে ঘিরে। একদিকে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে, অন্যদিকে ভোক্তা সংগঠনগুলো মূল্য নির্ধারণে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের দাবি জানাচ্ছে।
১৪ বছর ধরে আটকে থাকা প্রবিধানমালা শেষ পর্যন্ত কীভাবে এগোয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কোন পথে যাবে।

