জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বাড়ছে, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ওপর। দীর্ঘ সময় গরম ও আর্দ্র পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, পাশাপাশি কমছে উৎপাদন সক্ষমতাও।
এই পরিস্থিতিতে পোশাক কারখানায় তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন একটি নির্দেশনা বা ব্যবস্থাপনা কাঠামো দিয়েছে আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (এএফএএ)। সংগঠনটির তৈরি তাপ চাপ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় কারখানাগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সীমা নির্ধারণ, কাজের চাপ সমন্বয় এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গ্রিসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত ক্যাসকেলের বার্ষিক সভা ২০২৬-এ এই নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এর লক্ষ্য হলো পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করা।
বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে বিশেষ করে যেখানে পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা, বাতাস চলাচলের সুবিধা বা উন্নত কর্মপরিবেশ নেই, সেখানে উচ্চ তাপমাত্রা শ্রমিকদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠছে।
এএফএএর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কারখানাগুলোতে কর্মক্ষেত্রের তাপমাত্রার নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমের সময় কাজের সময়সূচি, শ্রমিকদের বিশ্রাম, পানি পান এবং প্রয়োজনীয় বিরতির ব্যবস্থা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে।
এ ছাড়া তাপজনিত অসুস্থতা শনাক্ত ও প্রতিরোধে শ্রমিক, তদারককারী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং সচেতনতা কর্মসূচির মাধ্যমে তাপের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এএফএএর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নেট হারম্যান বলেন, বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা এখন ক্রমেই সাধারণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থার মূল শক্তি শ্রমিকদের সুরক্ষায় শিল্পখাতকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংগঠনটি মনে করছে, শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এর ব্যয় শুধু কারখানার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ দায়িত্বের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তৈরি করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে তাপজনিত ঝুঁকি আরও বেশি। ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষণার বরাত দিয়ে এএফএএ জানিয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চ আর্দ্রতা, শ্রমনির্ভর অর্থনীতি এবং অভিযোজন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তাপের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে বিশ্বের ২৩টি পোশাক উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে ১৭টিতে বছরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আটটি পোশাক কারখানায় তাপজনিত চাপের কারণে গড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ কর্মঘণ্টার উৎপাদনশীলতা কমেছে।
গবেষণাটি বলছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অভিযোজন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ২৩৯ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। তিন বছরে এই ব্যয় করলে তা ২০২৫ সালের পোশাক রপ্তানি আয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশের সমান হবে।
গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের মতে, ২০২৫ সালে ঢাকা সাত মাস ধরে তাপজনিত চাপের মৌসুমের মধ্য দিয়ে গেছে, যা এখন নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি হয়ে উঠছে।
ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালেই বাংলাদেশে প্রায় ৭ কোটি শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে ছিলেন। গত দুই দশকের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে ৫১ শতাংশ।
একই সময়ে বাংলাদেশে তাপের কারণে শ্রমঘণ্টার ক্ষতি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় আড়াই গুণের বেশি ছিল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত অভিযোজন ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত কারণে মোট কর্মঘণ্টার ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। যা প্রায় ৩৮ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত কর্মক্ষেত্রের তাপমাত্রা বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৮ হাজার ৯৭০টি মৃত্যুর এবং ২ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার কর্মক্ষেত্রজনিত আঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা তাপজনিত চাপকে “অদৃশ্য ঘাতক” হিসেবে উল্লেখ করেছে। কারণ অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোকের মতো আকস্মিক সমস্যা ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র ও কিডনিসংক্রান্ত রোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি মো. তৌহিদুর রহমান জানিয়েছেন, তারা এখনো এএফএএর নতুন নির্দেশিকা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নন। তবে তাদের সংগঠন কয়েক বছর ধরে শ্রমিকদের জলবায়ু পরিবর্তন, তাপ এবং ন্যায়সংগত পরিবর্তন সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা এবং পানিবাহিত রোগের মতো সমস্যা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের জীবনে। তাই আন্তর্জাতিক ক্রেতা, ব্র্যান্ড এবং স্থানীয় উৎপাদকদের যৌথভাবে এই সমস্যার সমাধানে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এএফএএ এখনো সংগঠনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি দেয়নি। তবে অনেক কারখানা তাদের ক্রেতাদের কাছ থেকে এ ধরনের নির্দেশনা পেয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম শ্রমিকদের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। তাই শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় কারখানাগুলোতে তাপ নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিক সুরক্ষার ব্যবস্থা এখন আর অতিরিক্ত উদ্যোগ নয়, বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে।

