বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে চলমান দ্বাদশ সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইউনাইটেড কালচারস ফোরামের ফাঁকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে এই চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, শিল্প-সংস্কৃতি, জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। এটি শুধু একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পটভূমিতে একটি বড় কূটনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫তম anniversary। এই মাইলফলককে সামনে রেখে দুই দেশই সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ গত জুন মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছিলেন, ‘আমরা চাই এই anniversary-কে বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মতো 구체적인 চুক্তির মাধ্যমে উদযাপন করতে।’ সেই প্রতিশ্রুতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন হলো এই সাংস্কৃতিক সমঝোতা স্মারক। সাংস্কৃতিক কূটনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি জনগণের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা সরকারি কূটনীতির চেয়ে অনেক বেশি টেকসই ও গভীর হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি হবে, যা দুই দেশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়াতে সহায়ক হবে।
সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইউনাইটেড কালচারস ফোরাম ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এবং এটি বিশ্বের সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। এবারের ফোরামের প্রতিপাদ্য ‘ইউনাইটেড কালচারস, কমন ভ্যালুজ’। ফোরামে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বাংলাদেশের হাজার বছরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন লোকজ উৎসব, পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং বাংলা সঙ্গীতের বহুমাত্রিক ধারার পরিচয় তুলে ধরেন। ফোরামের দ্বিতীয় দিনে ‘ফোক আর্টিজান ক্র্যাফটওয়ার্ক রিবুটেড’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে তিনি বাংলাদেশের লোকশিল্প, কারুশিল্পের পুনর্জাগরণ এবং ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের বৈশ্বিক সম্ভাবনা নিয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এই উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের হস্তশিল্প ও লোকসংস্কৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
সাংস্কৃতিক সহযোগিতা শুধু রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফোরামের ফাঁকে মিয়ানমারের ধর্ম ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইউ টিন উ লুইনের সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাৎকালে দুই মন্ত্রী দুই দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, বৌদ্ধ ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং অভিন্ন ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সহযোগিতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করবে।
ফোরামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতি। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অনুষ্ঠিতব্য প্লেনারি সেশনে পুতিন উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ক্রেমলিন সূত্রে জানা গেছে, পুতিন ফোরামের অংশগ্রহণকারীদের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন এবং এই বছর ফোরামের প্রতিপাদ্যকে ‘বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পুতিনের উপস্থিতি এই ফোরামের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে।
সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকা ত্যাগ করে। প্রতিনিধি দলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দুইজন যুগ্মসচিবও রয়েছেন। ২৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফোরামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং শিল্পী বিনিময়ের মতো কার্যক্রম আরও জোরদার হবে বলে আশা করা যায়। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, আর্থিক প্রতিশ্রুতি এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। এখন দেখার বিষয়, এই কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে জনগণের পর্যায়ে পৌঁছায় এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

