জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফর শেষে দেশে ফেরার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত সোয়া এগারোটার দিকে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীরা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, ফ্লাইটটি আজ রাত আটটা নাগাদ দুবাই পৌঁছানোর কথা রয়েছে, সেখান থেকে রাত দুইটায় আবার রওনা হয়ে আগামীকাল সকাল পৌনে নয়টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দেন। মঙ্গলবারের এই ভাষণে তিনি বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। ভাষণে জাতিসংঘের মানবিক ও শান্তিরক্ষা উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে সংকট নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার জানিয়ে সরকারের পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন কৌশলের কথাও উল্লেখ করেন।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় বলে অভিহিত করেন এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান। সফরে তিনি জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত এবং শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন।
সফরকালে একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে কথা হয়। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে কথা বলেন তিনি, আর হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পারস্পরিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি উঠে আসে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সংবর্ধনায়ও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী দম্পতি। এর আগে একাধিক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক প্রাতরাশ বৈঠকে মানবিক সহযোগিতা ও জলবায়ু বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন তিনি, পাশাপাশি একটি স্বাস্থ্য-বিষয়ক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবা আধুনিকায়ন নিয়ে বৈঠক করেন।
জলবায়ু ন্যায্য রূপান্তর সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে তিনি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় অর্থায়নের দাবি জানান। ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেশের জাতীয় বিমান পরিবহন সংস্থার এগারোটি নতুন উড়োজাহাজ কেনার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ ও নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি নিয়ে একটি বিশেষ অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে তিনি কার্বন নিঃসরণ কমানো ও জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির প্রসারের ওপর জোর দেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও দুই দেশের সম্পর্ক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরকার প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যার একটি বড় অংশ নারী স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রশিক্ষিত ধাত্রী, পাশাপাশি একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান, পরে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির আয়োজিত নৈশভোজেও যোগ দেন তিনি।
সফরের শেষ দিনে ম্যানহাটনে একটি শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সব মিলিয়ে পাঁচ দিনের এই সফরে জাতিসংঘের নানা কর্মসূচির পাশাপাশি একাধিক দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।

