রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে পূর্বপরিকল্পিত ভাস্কর্যের বদলে এখন পানির ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর পাশাপাশি ৭ মার্চের ভাষণের হলোগ্রাফিক থ্রিডি উপস্থাপনার বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সাম্প্রতিক অগ্রগতি প্রতিবেদনে এই পরিকল্পনা পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। “ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ” শীর্ষক এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে, যার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে। মূল পরিকল্পনায় ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দুই স্থানে দুটি ভাস্কর্য নির্মাণের কথা ছিল।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন সরকারের পতনের পর এই উদ্যোগ থমকে যায়। যেসব স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণকাজ চলছিল, সেখানে সেসময় ভাঙচুরও চালানো হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছরের মার্চে জানিয়ে দেয়, উদ্যানে আর ভাস্কর্য দুটি নির্মিত হচ্ছে না। এখন বর্তমান সরকার সেই দুই স্থানে পানির ফোয়ারা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই পরিবর্তন নিয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি, একে অপরকে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত এই সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে সইকারী এক উপসচিব জানিয়েছেন, গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি তার নেই, যদিও নথিতে তার সই থাকার কথা তিনি স্বীকার করেছেন। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গেও একাধিকবার চেষ্টা করে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের তৃতীয় ও প্রথম সংশোধিত পর্যায়ে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চারশ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এর আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ছিয়াত্তর শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি চুরানব্বই শতাংশে পৌঁছেছে। নথিতে বলা হয়েছে, থানা নির্মাণের পাশাপাশি ঐতিহাসিক এই দুই স্থানে ভাস্কর্যের পরিবর্তে ওয়াটার ফাউন্টেন স্থাপনের জন্য নকশা পরিমার্জনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয়ের চাপে প্রকল্পের ভৌত কাজ ও কিছু স্থাপনার নকশায় পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হচ্ছে, তবে এই পরিবর্তন এখনো একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং সব নকশা এত সহজে বদলে ফেলা সম্ভব নয়, কারণ এটি একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মতে, এই দুই ঐতিহাসিক স্থান সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, ফলে সেখানে পরিকল্পনা পরিবর্তন হলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, তা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম কোণে ছবির হাটের প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে যে স্থানে ভাস্কর্য দুটি নির্মিত হওয়ার কথা ছিল, তা এখন টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা এবং ভেতরে কিছু নির্মাণাধীন অবকাঠামো রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় গুরুত্বের প্রকল্পে এই ধরনের পরিবর্তন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

