নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজের দুইদিন পর একই পরিবারের তিন ভাই-বোনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ঘাটের আশপাশ থেকে ভাসমান অবস্থায় মরদেহগুলো উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ-পুলিশ। উদ্ধার হওয়া তিনজন হলেন হেলাল উদ্দিনের মেয়ে সামিনা (১৭) এবং দুই ছেলে সজিব (২৪) ও সামিন (৫)। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তাদের বাবা হেলাল উদ্দিন (৫৫)। দুইদিন ধরে চলো উদ্ধার অভিযানেও তাকে পাওয়া যায়নি, যা এই ঘটনাকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রাম থেকে সোনারগাঁয়ের সোনাময়ী গ্রামে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ট্রলারে করে রওনা হন ১৪ জন যাত্রী। তাদের সঙ্গে ছিল দুটি গরু ও একটি ছাগল। ট্রলারটি বৈদ্যেরবাজারের হাড়িয়া বৈদ্যেপাড়া গ্রামের উদ্দেশে যাচ্ছিল। পথে মেঘনা নদীর সোনাময়ী এলাকায় হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়। এ সময় নৌকায় থাকা যাত্রীরা পানিতে পড়ে যান। তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ আমান সিমেন্ট কোম্পানির একটি ট্রলার উদ্ধার অভিযানে নামে এবং আটজনকে জীবিত উদ্ধার করে। পরে রায়েশা বেগম (৫৫) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নিখোঁজ হেলাল উদ্দিনের খালা ছিলেন। এরপর থেকেই একই পরিবারের চারজন নিখোঁজ হয়ে যান।
ট্রলারডুবির পরপরই ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে অভিযান শুরু হয় এবং রাত ৩টা পর্যন্ত চলে। শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে আবারও অভিযান শুরু করা হয়। পানির নিচে অনুসন্ধানের জন্য ক্যামেরা ব্যবহার করা হয় এবং ডুবুরি দল বিভিন্নভাবে খোঁজ চালায়। অবশেষে শনিবার ভোর ২টা ৫৫ মিনিটে সামিনার মরদেহ এবং সকাল ৮টা ১০ মিনিটে সজিব ও সামিনের মরদেহ বৈদ্যেরবাজারের আল মোস্তফা ফ্যাক্টরির সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিখোঁজ চারজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও একজনকে উদ্ধারে অভিযান চলছে।
হেলাল উদ্দিন কুমিল্লার হোমনা পৌরসভার শ্রীমদ্দি গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। তার মরদেহ উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয়রা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সোনারগাঁ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ জাহেদ চৌধুরী জানান, পানির নিচে অনুসন্ধানের জন্য ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ডুবুরি দল বিভিন্নভাবে খোঁজ চালাচ্ছে। বৈদ্যেরবাজার নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক শাহ কামাল জানান, ট্রলারটিতে ১৪ জন যাত্রী ছিলেন এবং ঝড়ের কবলে পড়ে এটি ডুবে যায়।
মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় নিখোঁজদের স্বজনেরা দুইদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। তিন ভাই-বোনের মরদেহ উদ্ধারের খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। একটি বিয়ের আনন্দ অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে, যা স্থানীয়দের মাঝে গভীর শোক তৈরি করেছে। নিহতরা সবাই একই পরিবারের সদস্য ছিলেন, একটি পরিবারের তিনটি প্রাণ একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া এই ঘটনা এলাকায় ব্যাপক শোকের সৃষ্টি করেছে।
এই দুর্ঘটনা নদীপথে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘনা নদীতে প্রায়ই হঠাৎ ঝড় ও উঁচু ঢেউ দেখা দেয়, যা ছোট ট্রলারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। যাত্রীবাহী ট্রলারে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের অভাব, জনবল সংকট এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত সতর্কতা না থাকা এসব দুর্ঘটনার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। নৌ-পথে চলাচলকারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নিয়ম ও পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

