প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, দুর্বল অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত পর্যটনসেবা না থাকায় গত দুই বছর ধরে বিদেশি পর্যটক আগমনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংকলিত বিশেষ শাখা পুলিশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে বিদেশি পর্যটক এসেছেন ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০ জন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কম।
এর আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ৬ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি বিদেশি দর্শনার্থী এসেছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিদেশি পর্যটক আগমনে পতন দেখা গেছে। ২০২৫ সালে দেশে বিদেশি পর্যটক এসেছেন ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ কম।
পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান এবং সংস্কৃতির বড় সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের স্বাগত জানানোর মতো প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়।
ইউনাইটেড ট্যুরিজম স্টেকহোল্ডার্স সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি এইচ এম হাকিম আলী বলেন, দেশের বাইরে থেকে পর্যটক এনে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে পর্যটন আকর্ষণের অনেক উপাদান রয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় বিপণন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, মানসম্মত রেস্তোরাঁ ও পর্যটন স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে।
বিদেশি পর্যটক কমে যাওয়ার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিষয়টিও জড়িত। কারণ প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশ ভ্রমণ করেন, ফলে দেশের অর্থ বাইরে যাচ্ছে। পর্যটন খাত শক্তিশালী হলে এই প্রবাহের একটি অংশ দেশের ভেতরে ধরে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইনোগ্লোব ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এমডি তসলিম আমিন শোভন বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বিদেশি পর্যটক কমার অন্যতম কারণ।
তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস আগে বাংলাদেশ ভ্রমণ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছিল। এখনো অনেক ক্ষেত্রে সেই সতর্কতা পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি।
তিনি বলেন, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ই-ভিসা চালু, বিমানবন্দরে আলাদা সেবা ডেস্ক এবং দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বর্তমানে বিমানবন্দরে অনেক সময় পর্যটকদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক সন্তোষ কুমার দেব বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে বাংলাদেশের মূল্য, সেবা ও মান উন্নত করতে হবে।
তার মতে, দেশের পর্যটকদের প্রায় ৯০ শতাংশই অভ্যন্তরীণ এবং মাত্র ১০ শতাংশ আন্তর্জাতিক পর্যটক। এই অনুপাত পরিবর্তনের জন্য শক্তিশালী ডিজিটাল প্রচারণা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গল্প বলা, কিউআর কোড, ছোট ভিডিও প্রচারণা, অনলাইন বুকিং, ই-ভিসা, স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন এবং ক্যাশলেস পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলে বিদেশি পর্যটকদের অভিজ্ঞতা উন্নত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।
পর্যটন পুনরুজ্জীবনে সরকার এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের মূল প্রতিপাদ্যও ছিল ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনের নতুন রূপ তৈরি করা।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার বলেন, সরকার পর্যটন খাতের অবদান জিডিপির বর্তমান ২ থেকে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশে নিতে চায়।
এ লক্ষ্যে পর্যটন মহাপরিকল্পনা হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান পরিমাপের জন্য ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির কাজ চলছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানান, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে আন্তর্জাতিক প্রচারণা বাড়ানো হবে। এ জন্য বিদেশি কূটনীতিক, ব্লগার, ইনফ্লুয়েন্সার ও সাংবাদিকদের যুক্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা বড় হলেও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে শুধু আকর্ষণীয় স্থান নয়, নিরাপদ পরিবেশ, সহজ ভ্রমণ ব্যবস্থা এবং উন্নত সেবার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

