রাহাদ সুমন,বরিশাল প্রতিবেদক-
একটি রুটি, এক কাপ চা, আর বাবার প্রতি একটি নিষ্পাপ শিশুর ভালবাসা, দেশ-বিদেশের নেটিজেনদের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা আর মমতার কাছে পরাজিত হয়েছে জনতার হিংস্রতা, কঠোরতা। আর জয়ী হয়েছে একটি ছোট্ট নিষ্পাপ মেয়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
আর সেই সাথে, ভাগ্য পরিবর্তন হতে শুরু করেছে একটি পরিবারের। ব্যাপক আলোচিত এ ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের। সর্বশেষ রবিবার বিকেলে সরেজমিন পরিদর্শনে এসে সেই আলোচিত শিশু কন্যা ও তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবর নিয়েছেন উজিরপুর উপজেলার মানবিক নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা।
ভূক্তভোগী কর্মহীন শিক্ষিত যুবক রায়হানুল হক অনিক ভালভাবে সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসতে পারলে, তাকে কর্মজীবী করে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মাদ আলী সুজা এবং সেই শিশু কন্যার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন ইউএনও। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলী সুজা বলেন, অনিক শিকদার খারাপ অভ্যাস পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেবো এবং তার শিশু কন্যার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছি।
রায়হানুল হক অনিক শিকদার বলেন, উদ্দেশ্যে প্রনেদিতভাবে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি পূর্ব শত্রুতার জের ধরে আমাকে চোর আখ্যাদিয়ে বাজারের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করেছে। অপরদিকে বামরাইল বাজারের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রেখে বাবাকে নির্যাতনের কথাশুনে পরিবারের সবার অজান্তেই সেখানে ছুঁটে গিয়েছিলো রায়হানুল হক অনিকের নিষ্পাপ মেয়ে। সে তার বাবার প্রতি যে পরম মমতা দেখিয়েছেন, তা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেই শিশুটি বলে, আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। সে কখনও চুরির সাথে জড়িত হতে পারেন না।
তবে রায়হানুল হক অনিক তার কতিপয় বন্ধুর প্ররোচনায় আগে মাদকাসক্ত ছিলেন জানিয়ে তার স্ত্রী বলেছেন, সে (অনিক) কোনদিন চুরির সাথে জড়িত ছিলেন না। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে কতিপয় ব্যক্তি তাকে (অনিক) জোর পূর্বক বেঁধে রেখে মারধর করে চোর বানাতে চেয়েছিলেন।
বামরাইলের প্রবাস ফেরত ওমর খসরু তুহিন বলেন, ‘পারিবারিকভাবে তারা ভালো, সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত পরিবারের ছেলে। কিন্তু নেশার ভয়াল থাবা ধ্বংস করে দিয়েছে তার পুরো পরিবার ও বংশের মান-সম্মান। অনিক যথেষ্ট শিক্ষিত ও মার্জিত ছেলে।
এদিকে সেই কন্যার খোঁজে ছুটে গিয়েছিল ‘ওয়াব’ টিম। তাদের সহযোগিতা করেন উজিরপুর থানা পুলিশ। উই আর বাংলাদেশের (ওয়াব) প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এস এম আকবর তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, মূলতঃ অনিক শিকদার চোর না। অনিক শিকদারের বাবা একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ ছিলেন। তিনি অসুস্থ হওয়ার পর তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে সবকিছু হারিয়েছে পরিবার। মাঝে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো অনিক। সেই সুযোগটা নিয়েছে স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেটের দল।
ভিডিওটি দেখে নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি। তথ্য যাচাই করার জন্য ‘ওয়াব’ বরিশাল টিমকে অবহিত করি। ওয়াব এর স্বেচ্ছাসেবকরা ছুটে গিয়েছিলেন সেই বাচ্চাটির কাছে। খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে। ও চাচ্ছে আমরা যেন ওর বাবাকে একটি কর্মসংস্থান করে দেই। অনিক শিকদার ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালো ও আলোর পথে ফিরে আসতে চায়। তিনি আরও বলেন, তাকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়েছি আমরা। বিষয়টি নিয়ে উজিরপুর থানা পুলিশের সাথে কথা বলেছি। উজিরপুর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ফারুক হোসেনের সাথেও কথা হয়েছে। তিনিও আমাদের সাথে সম্মতি জানিয়েছেন এবং সার্বিকভাবে দেখাশোনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
যেহেতু গ্রামাঞ্চল তাই অনিক শিকদার একটি অটোভ্যান চেয়েছেন। আমরা WAB Foundation এর পক্ষ থেকে একটি অটোভ্যান কিনে দেবো। মেয়েটির লেখাপড়ার দায়িত্ব আমরা নিতে চাই ইনশাআল্লাহ। অপরদিকে দেশ-বিদেশের অসংখ্য নেটিজেনরা রায়হানুল হক অনিকের সাথে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে, তার কর্মহীন জীবনের কথাশুনে তাকে সহায়তার মাধ্যমে কর্মজীবী করার আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ছিচকে চুরির আপবাদ দিয়ে শুক্রবার দিবাগত রাতে বামরাইল বাজারের একটি খুঁটির সাথে রায়হানুল হক অনিক শিকদারকে বেঁধে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করেছে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি। শনিবার ভোরে এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে অনিকের নিষ্পাপ রাজকন্যা। এরপর সারারাত অনাহারে কাটানো অনিকের জন্য বাজারের একটি দোকান থেকে রুটি ও এককাপ চা এনে ওই রাজকন্যা বেঁধে রাখা বাবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিলো। স্থানীয় এক যুবক বিষয়টি ভিডিও ধারন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে মুহুর্তের মধ্যে তা ব্যাপক ভাইরাল হয়।

