গবেষণার সীমিত সুযোগ, শিক্ষার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এবং উন্নত ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় বিদেশমুখী হচ্ছেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। গত এক দশকে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এই প্রবণতা উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে উচ্চশিক্ষার ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে ভালো একটি চাকরি পাওয়াই ছিল অধিকাংশ শিক্ষার্থীর প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে সেই ভাবনা। এখন অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করার আগেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা শুরু করছেন। কেউ উন্নত গবেষণার সুযোগ খুঁজছেন, কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দক্ষতা অর্জন করতে চাইছেন, আবার কেউ বিদেশি ডিগ্রিকে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু বিদেশে পড়াশোনার আকর্ষণ কাজ করছে না। দেশের উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণার অবকাঠামো, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্যও শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
ফলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা এখন আর কেবল ব্যক্তিগত স্বপ্নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এক দশকে বিদেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কতটা বেড়েছে, তা আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বিদেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ১১২ জন। ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে।
অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ২৮ হাজার ৬৮৭ জন। বৃদ্ধির হার প্রায় ১১৯ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রতি বাংলাদেশি তরুণদের আগ্রহ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রবণতা ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে।
অন্যদিকে, শিক্ষা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান মেন্টরস এডুকেশনের অনুমান অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার কিংবা তারও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনার উদ্দেশ্যে বিদেশে যান।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যানে নির্দিষ্ট সময়ে বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রতিবছর বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আনুমানিক সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দুটি পরিসংখ্যানকে সরাসরি একই ধরনের তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
তবু উভয় তথ্যই একটি বাস্তবতা সামনে আনে—বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
গবেষণার সুযোগের অভাব কি শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী করছে?
বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গবেষণার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নীতিনির্ধারণ কিংবা বিশেষায়িত পেশায় যুক্ত হতে চান, তাঁদের কাছে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ, দক্ষ তত্ত্বাবধায়ক, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞানচর্চার সুযোগ।
বাংলাদেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষক থাকলেও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, উন্নত প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে পাওয়া যায় না।
ফলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান করেন, যেখানে তাঁদের গবেষণার আগ্রহকে বাস্তব কাজের মাধ্যমে বিকশিত করার সুযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়ার লিংকন ইউনিভার্সিটি কলেজে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি করছেন মো. শিবলী নোমান খান। তাঁর বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অন্যতম উদ্দেশ্য দক্ষ গবেষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।
তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিদেশে পড়াশোনা তাঁকে গবেষণার জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ দিয়েছে।
তবে তাঁর লক্ষ্য বিদেশেই স্থায়ী হওয়া নয়। উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করা অথবা শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী সবাই দেশ ছেড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চান না। অনেকে উন্নত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেশে ফিরে কাজ করার পরিকল্পনাও করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশে ফিরে তাঁদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য কতটা উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে?
উচ্চশিক্ষিত গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি না হলে বিদেশ থেকে অর্জিত জ্ঞান দেশের উন্নয়নে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারবে না। তাই শিক্ষার্থীদের বিদেশযাত্রার পাশাপাশি তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রতি আস্থার সংকট
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি হলো শিক্ষার মান এবং ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা।
দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগও আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন সব সময় একই গতিতে ঘটে না।
শিক্ষার্থীদের একটি অংশের কাছে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে এই গুণগত মানের প্রশ্নও কাজ করছে।
শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমেদের মতে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে অনেক ক্ষেত্রেই বেশি মূল্যবান হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ডিগ্রির মান নিয়ে আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
তাঁর পর্যবেক্ষণে, শিক্ষার মানের পার্থক্য এবং দেশে-বিদেশে কর্মজীবনের সুযোগের ভিন্নতা শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বিদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে উন্নত—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশেও মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে বিদেশেও এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের শিক্ষার মান কিংবা কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা প্রত্যাশিত পর্যায়ে নাও থাকতে পারে।
তাই বিদেশি ডিগ্রির মূল্যায়ন শুধু কোন দেশে ডিগ্রি অর্জিত হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, পাঠ্যক্রম, গবেষণার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর অর্জিত দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে সেটি নীতিনির্ধারকদের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।
কারণ একটি দেশের তরুণ প্রজন্ম যদি মনে করে, নিজেদের যোগ্যতা বিকাশের জন্য দেশের বাইরে যাওয়াই অধিক কার্যকর পথ, তাহলে সেই ধারণার পেছনের বাস্তব কারণগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ডিগ্রি আছে, কিন্তু উপযুক্ত চাকরি কোথায়?
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু তাঁদের সবাই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পান না।
অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে পড়াশোনা করেন, সেই বিষয়ে কর্মজীবন গড়ার সুযোগ সীমিত থাকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশিত ব্যবহারিক দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত শিক্ষার ব্যবধান দেখা যায়।
এই বাস্তবতায় বিদেশে উচ্চশিক্ষা অনেকের কাছে নতুন সম্ভাবনার পথ হয়ে ওঠে।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং পেশাগত যোগাযোগ গড়ে তোলার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে বিদেশে পড়াশোনা করলেই যে ভালো চাকরি নিশ্চিত হবে, তা নয়।
কর্মসংস্থানের সুযোগ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজার, শিক্ষার্থীর দক্ষতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, কাজের অনুমতি এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতির ওপর।
একইভাবে বিদেশি ডিগ্রি অর্জনের অর্থ স্থায়ীভাবে বসবাসের নিশ্চয়তাও নয়।
অতএব বিদেশে উচ্চশিক্ষাকে কর্মজীবনের নিশ্চিত সমাধান হিসেবে দেখার পরিবর্তে সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—দুই দিক থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ছে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের ‘ওপেন ডোরস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ১৫৬ জন।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, জার্মানি এবং জাপানেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন।
তবে এসব দেশে যাওয়ার কারণ এক নয়।
কেউ উন্নত গবেষণাগারের সুযোগ বিবেচনা করেন, কেউ নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করতে চান। আবার কারও কাছে বৃত্তি, পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন কিংবা ভবিষ্যৎ পেশাগত সুযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার ভিন্ন হয়।
গবেষণায় আগ্রহী একজন শিক্ষার্থীর কাছে অভিজ্ঞ তত্ত্বাবধায়ক ও গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, পেশাভিত্তিক শিক্ষায় আগ্রহী আরেকজনের কাছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই কারণে শুধু কোনো দেশের জনপ্রিয়তা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতির ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া সব সময় সুফল বয়ে আনে না।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
বিদেশে পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, আবাসন, খাবার, যাতায়াত, স্বাস্থ্যবিমা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতে হয়। এসব খরচের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে অনুমোদিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশে শিক্ষার খরচ ও জীবনযাপনের ব্যয় বাবদ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলার।
এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ মার্কিন ডলার।
অর্থাৎ এক অর্থবছরের ব্যবধানে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বেড়েছে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ।
এই বৃদ্ধির পেছনে বিদেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি, টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিবর্তনসহ একাধিক কারণ থাকতে পারে। তবে শুধু মোট ব্যয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে কোন কারণটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে।
বাংলাদেশের পরিবারগুলো যখন সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিপুল অর্থ বিদেশে ব্যয় করছে, তখন সেই বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত?
একদিকে বিদেশে অর্জিত শিক্ষা, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আয় ও পেশাগত সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে সব শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত চাকরি কিংবা আয় অর্জন করতে না পারলে উচ্চশিক্ষায় ব্যয় করা অর্থ পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
আবার বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে কেউ দেশে ফিরে উদ্যোক্তা, গবেষক, শিক্ষক বা দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে অবদান রাখলে সেই শিক্ষার সুফল দেশের অর্থনীতিতেও পৌঁছাতে পারে।
তাই বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয়কে এককভাবে অর্থের অপচয় বা নিশ্চিত লাভ হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিসংগত নয়। এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে শিক্ষার মান, অর্জিত দক্ষতা এবং ভবিষ্যতে সেই দক্ষতার ব্যবহারের ওপর।
পরিবারের জন্য বিদেশে পড়াশোনা কতটা বড় সিদ্ধান্ত?
বাংলাদেশের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সন্তানের বিদেশে উচ্চশিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার বিষয়।
অনেক পরিবার বছরের পর বছর সঞ্চয় করেন। কেউ পারিবারিক সম্পদের ওপর নির্ভর করেন, আবার কেউ শিক্ষাবৃত্তি বা গবেষণা সহায়তার মাধ্যমে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ফি বিবেচনা করলেই প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায় না।
আবাসন, খাদ্য, যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা, বিমা এবং আনুষঙ্গিক খরচও মোট ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পেলেও অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন না।
মেধাভিত্তিক বৃত্তি এবং অর্থায়নসহ গবেষণার সুযোগ এই চাপ কমাতে পারে। কিন্তু এসব সুযোগের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা থাকে।
ফলে বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের শুধু ভর্তির সুযোগ নয়, পুরো শিক্ষাকালীন সম্ভাব্য ব্যয় এবং অর্থায়নের নিশ্চয়তাও বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষ করে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার বাইরে গিয়ে উচ্চব্যয়ের কোনো শিক্ষাক্রমে ভর্তি হলে প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
বিদেশি ডিগ্রি কি সত্যিই সফলতার নিশ্চয়তা?
বাংলাদেশের সমাজে বিদেশি ডিগ্রিকে অনেক সময় বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে দেখা হয়।এই সামাজিক ধারণা শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কিংবা বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত দক্ষতার বিকল্প নয়।
একজন শিক্ষার্থী বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেও চাকরির বাজারে সমস্যায় পড়তে পারেন। আবার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেও গবেষণা, প্রযুক্তি, ব্যবসা বা অন্যান্য পেশায় সফল হওয়া সম্ভব।
এখানে মূল পার্থক্য তৈরি করে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম কতটা যুগোপযোগী, শিক্ষকরা কতটা দক্ষ, ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ কতটা রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কতটা অর্জন করছেন—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কিংবা আন্তর্জাতিক পরিচিতি বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রমের মান, গবেষণার সুযোগ, অর্থায়ন এবং সম্ভাব্য কর্মজীবনের পথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মেধাপাচার, নাকি আন্তর্জাতিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ?
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এলেই মেধাপাচারের প্রশ্ন সামনে আসে।
তবে বিদেশে যাওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মেধাপাচারের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ নয়।
কারণ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া, পড়াশোনা শেষে বিদেশে চাকরি করা এবং স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করার সিদ্ধান্ত—তিনটি আলাদা বিষয়।
অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরেন। কেউ বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেন। আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশেই পেশাগত জীবন গড়ে তোলেন।
এই ভিন্ন বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় না নিয়ে বিদেশমুখী শিক্ষার্থীদের সবাইকে একইভাবে মূল্যায়ন করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিদেশে অবস্থানরত দক্ষ বাংলাদেশিরাও গবেষণা সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান বিনিময় কিংবা দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারেন।
কিন্তু সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রবাসী গবেষক ও পেশাজীবীদের কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি।
অন্যদিকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইলে তাঁদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে পেশাগত অগ্রগতির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
শুধু দেশপ্রেমের আহ্বান জানিয়ে দক্ষ জনশক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনা বা ধরে রাখা কঠিন, যদি তাঁদের কাজ করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হয়।
শিক্ষার্থীদের বিদেশযাত্রা নিরুৎসাহিত করা কি সমাধান?
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ কায়কোবাদ বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের বিষয়টিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটেও মূল্যায়ন করেছেন।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব বৈশ্বিক গড়ের প্রায় ২৪ গুণ। ফলে সীমিত সম্পদ ও কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক চাপ তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে যেসব শিক্ষার্থী নিজেদের সামর্থ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, তাঁদের নিরুৎসাহিত করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিদেশে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃহত্তর সমাজের উপকারে আসতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রচলিত আলোচনায় ভিন্ন একটি মাত্রা যোগ করে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সব উচ্চশিক্ষিত তরুণের জন্য একই ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করা সহজ নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ তাই এক ধরনের বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকে পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
বরং দুটি বিষয় একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
একদিকে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও উন্নত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোথায় পিছিয়ে পড়ছে?
বিদেশমুখী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধির আলোচনায় দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা নতুন বিভাগ চালু করলেই আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত হয় না।
একটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক পাঠ্যক্রম, পর্যাপ্ত গবেষণা অর্থায়ন, উন্নত অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাভাবনার পরিবেশ।
বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যেও কার্যকর সংযোগ থাকা জরুরি।
শিক্ষার্থীরা যদি পড়াশোনার সময় বাস্তব সমস্যার সমাধান, গবেষণা প্রকল্প, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান, তাহলে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এখানে গবেষণা অর্থায়নের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব শিক্ষার্থী উচ্চতর গবেষণায় আগ্রহী, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল, গবেষণা সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞ তত্ত্বাবধায়ক না থাকলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে পারে।
একইভাবে পাঠ্যক্রম দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থাকলে নতুন প্রযুক্তি ও পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু অবকাঠামোর সম্প্রসারণ নয়, শিক্ষার ফলাফল ও গবেষণার গুণগত মানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদেশমুখী প্রবণতা থেকে কী শিখতে পারে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগ্রহকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীরা মূলত এমন একটি পরিবেশ খুঁজছেন, যেখানে তাঁদের সময়, শ্রম ও অর্থের বিনিময়ে মানসম্মত শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে যাওয়ার পরিবর্তে দেশেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।এ জন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন জরুরি।
প্রথমত, গবেষণায় অর্থায়ন বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত গবেষণার সুযোগ তৈরি হলে উচ্চশিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দেশে থেকেই জ্ঞানচর্চা করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করতে হবে। উচ্চশিক্ষাকে পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, পেশাগত দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, শিক্ষক ও গবেষকদের পেশাগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দূরত্ব কমাতে হবে। শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কমানো সম্ভব।
পঞ্চমত, দেশে উচ্চতর গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে অগ্রগতির ব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তিকে ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এসব পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং শিক্ষার গুণগত মান যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা।
শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তে কী গুরুত্ব পাওয়া উচিত?
বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরিকল্পনা করছেন এমন শিক্ষার্থীদের জন্যও এই প্রবণতা কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।শুধু বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা কিংবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
প্রথমেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন, উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষার্থী কোন ধরনের পেশায় যেতে চান।
গবেষণাভিত্তিক কর্মজীবনের জন্য যে শিক্ষাক্রম উপযুক্ত, পেশাগত দক্ষতাভিত্তিক কর্মজীবনের জন্য সেটিই সব সময় সবচেয়ে কার্যকর নাও হতে পারে।
এরপর সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষকদের দক্ষতা এবং অর্থায়নের সুযোগ বিবেচনা করা জরুরি।
একই সঙ্গে পড়াশোনার মোট খরচ, সম্ভাব্য কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ আয়ের বাস্তব সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কারণ বিদেশে উচ্চশিক্ষা শুধু শিক্ষাগত সিদ্ধান্ত নয়; অনেক পরিবারের জন্য এটি জীবনের অন্যতম বড় আর্থিক সিদ্ধান্তও।
শেষ কথা: তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার পেছনে যে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা।
এর পেছনে রয়েছে উন্নত গবেষণার আকাঙ্ক্ষা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের আগ্রহ, শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা।
এই প্রবণতাকে শুধুই দেশের মেধা হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। আবার বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকে সবার জন্য নিশ্চিত সাফল্যের পথ হিসেবে বিবেচনা করাও যুক্তিসংগত হবে না।
বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কেন বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন সুযোগ খুঁজে পাচ্ছেন, যা তাঁরা দেশের ভেতরে পর্যাপ্তভাবে পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মজীবন গড়ার পরিবেশ তৈরি করা গেলে পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
একই সঙ্গে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশিদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর বাস্তব উদ্যোগও প্রয়োজন।
মূল প্রশ্নটি তাই শিক্ষার্থীরা কেন বিদেশে যাচ্ছেন, শুধু সেটি নয়। বরং বাংলাদেশ তাঁদের এমন কী সুযোগ দিতে পারছে না, যার জন্য তাঁরা দেশের বাইরে ভবিষ্যৎ খুঁজছেন?
এই প্রশ্নের কার্যকর উত্তর খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

