দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষিত তরুণদের জন্য উপযুক্ত কাজের সুযোগ সেই হারে বাড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়েও অনেকে বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় আছেন। অন্যদিকে কম শিক্ষিত বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা অনেকেই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ পেয়ে আয় করছেন। দারিদ্র্য কমার হিসাবেও নিরক্ষর পরিবারগুলো এগিয়ে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিন বছর আগে পড়াশোনা শেষ করেছেন আমিরুল ইসলাম। স্বপ্ন ছিল ভালো চাকরি করে স্বাবলম্বী হবেন। এখন তিনি নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বসে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সীমিত সুযোগের বিপরীতে হাজারো প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তিনি ক্লান্ত। আমিরুল বলেন, ২০২৩ সালে পড়াশোনা শেষ করেছেন, এখন চাকরির জন্য পড়ছেন। অথচ তাঁর এলাকার এসএসসি পাস করা বন্ধুদের কেউ বিদেশে, কেউ দেশে ব্যবসা করছেন। তাঁরা অনেক এগিয়ে গেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী জানান, তিনি প্রথম বিসিএসে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এখন অন্য চাকরির চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না, যা জাতি হিসেবে হতাশার। আমিরুলের মতো উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা কম নয়। শিক্ষার হার বাড়লেও সেই অনুপাতে উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও বড় একটি অংশের জন্য কাজের নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে না।
দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রেও শিক্ষার সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের চারটি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৭ বছরে নিরক্ষর পরিবারে অতি দারিদ্র্যের হার কমেছে ২৭ শতাংশ পয়েন্টের বেশি। একই সময়ে শিক্ষিত পরিবারে এই হার কমেছে মাত্র সাড়ে ৮ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ নিরক্ষর পরিবারে অতি দারিদ্র্য কমার হার শিক্ষিত পরিবারের তিন গুণেরও বেশি। উচ্চ দারিদ্র্যসীমার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
এই সংকটের সঙ্গে অর্থনীতির গঠনের সম্পর্ক আছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বড় হয়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজের সুযোগ একই হারে বাড়েনি। বরং বিস্তার ঘটেছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের।
ফলে উচ্চশিক্ষিতদের বড় অংশ নিজেদের যোগ্যতা ও প্রত্যাশার সঙ্গে মানানসই কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন। বিপরীতে কম শিক্ষিত মানুষ কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন ও নির্মাণের মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে দ্রুত যুক্ত হতে পারছেন।
সাবেক শিক্ষা ও বিজ্ঞান সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান সময়ের চাহিদার যথাযথ মিল নেই। যুগোপযোগী শিক্ষা নিয়ে ভাবার মানুষ কম। তাঁর মতে, শিক্ষা এখন বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে, তাই এই নৈরাজ্য কাটছে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পর্যায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সনদনির্ভর উচ্চশিক্ষা দিয়ে কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এর জন্য তিনটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম বদলাতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের সংযোগ জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়ানোও জরুরি। কারণ প্রবৃদ্ধি যদি মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক ও কম উৎপাদনশীল কাজের ওপর নির্ভর করে, তাহলে উচ্চশিক্ষার সুফল কর্মসংস্থান ও আয়ে পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না।
গত দেড় দশকে দেশে শিক্ষার সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও বেড়েছে। কিন্তু সেই শিক্ষাকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে শিক্ষিতদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু উচ্চশিক্ষার বিস্তার নয়, বরং শিক্ষার মান, প্রাসঙ্গিকতা এবং শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে তার সংযোগ নিশ্চিত করা।

