বাসায়, অফিসে কিংবা চলার পথে, হাতের মুঠোফোনেই এখন অনেকের দিনের বড় অংশ কাটে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের রঙিন রিলসের জগৎ, আবার মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের লম্বা তালিকা, সবই এক ডিভাইসে। ফলে চাইলেও এক ঘণ্টা ফোন দূরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই আসক্তির দাম কি সম্পর্কের গভীরতা দিয়ে চুকাতে হচ্ছে?
গবেষণার তথ্য সে ইঙ্গিতই দেয়। ২০২৫ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ৫২টি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ জন। এতে দেখা যায়, সঙ্গীর সামনে ফোন ব্যবহার করে তাঁকে উপেক্ষা করা, যাকে বলা হয় ‘পার্টনার ফাবিং’, সম্পর্ক ও দাম্পত্য সন্তুষ্টি, আন্তরিকতা এবং পারস্পরিক সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি দ্বন্দ্ব ও ঈর্ষাও বাড়ায়। অন্যান্য গবেষণাও বলছে, মোবাইল আসক্তি একাকিত্ব ও সামাজিক উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
বাস্তব জীবনের চিত্র আরও স্পষ্ট। ৫২ বছর বয়সী নাসিমা বেগম বলেন, সারাদিন তিনি বাসায় একা থাকেন। ঘরের কাজ শেষ করে অপেক্ষা করেন স্বামী ও সন্তান ফিরলে কথা বলবেন। কিন্তু ঘরে ফিরেও সবাই যেন আলাদা জগতে ঢুকে পড়ে। কেউ গেম খেলে, কেউ রিল দেখে। স্বামীও এখন বেশির ভাগ সময় ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়েই কথা বলেন। তাঁর ভাষ্যে, কথা বলার মানুষগুলো খাবার টেবিলেও হাতে মোবাইল নিয়ে বসে।
২৬ বছর বয়সী সুমনার অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি জানান, শেষ কবে পুরো এক ঘণ্টা ফোন না ধরে কেটেছে, তা মনে করতে পারেন না। বাবা-মা বা বন্ধুদের সঙ্গে থাকলেও রিল স্ক্রল করেন কিংবা বার্তার উত্তর দেন। এটি এখন তাঁর কাছে প্রায় স্বয়ংক্রিয় অভ্যাস। আড্ডায় গেলেও অনেকেই ফেসবুক স্ক্রল করেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা তৌহিদা শিরোপা বলেন, মোবাইলে খোঁজখবর নেওয়া বা ছবি শেয়ার করা পর্যন্ত ঠিক আছে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সোশ্যাল মিডিয়া ও ফোনে এতটাই ডুবে থাকা হয় যে প্রকৃত কথোপকথন আর হয় না। ভার্চ্যুয়াল জগতের আবেগকে তখন আসল মনে হয়, অথচ প্রকৃত আবেগ আসে মুখোমুখি কথা থেকে। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ফোনে ব্যস্ত থাকলে মানুষ বাস্তব কথোপকথন এড়িয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শুধু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মিম বা রিল পাঠিয়ে যোগাযোগ হয়ে গেছে ভাবলে আসল কথা বলার অভ্যাসই হারিয়ে যায়।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ‘মনের বন্ধু’ও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। তাদের মতে, অনেকক্ষণ ফোনে থাকার পর কথা বলার অভ্যাস কমে যায়, তখন টেক্সট করে দেওয়াই সহজ মনে হয়। অথচ সরাসরি কথোপকথনে আবেগ থাকে, মাঝে মাঝে বাকবিতণ্ডাও হয়, যা অনেকে এড়াতে চান। শোনার ধৈর্যও কমছে, আর সবাই দ্রুত গল্পের শেষে পৌঁছাতে চান। ফলে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে অনীহা বাড়ছে।
তৌহিদা শিরোপা আরও সতর্ক করেন, মোবাইলে অতিরিক্ত নির্ভরতা আচরণগত আসক্তির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এখন এমন একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যাদের বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ, এমনকি আত্মপরিচয়ের বড় অংশ গড়ে উঠছে পর্দার ভেতর দিয়ে। ফোন তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়, কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। এতে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে এবং সরাসরি মানুষের সঙ্গে থাকতে অস্বস্তি তৈরি হয়, যা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে সব পরিবারের চিত্র এক নয়। গ্রাফিক ডিজাইনার ইসাবেলা (২৭) জানান, তাঁদের বাসায় মোবাইল তুলনামূলক কম ব্যবহার হয়। বাবার সঙ্গে সাহিত্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও দেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা হয়, মায়ের সঙ্গে গল্প হয় বন্ধু ও সহকর্মীদের নিয়ে। তাঁর ভাষ্য, তখন বোঝা যায় মোবাইল ছাড়াও সুন্দর সময় কাটানো সম্ভব। এই উদাহরণ দেখায়, সমস্যাটি অনিবার্য নয়, বরং অভ্যাসের প্রশ্ন।
সমাধানের পথও তাই অভ্যাসের মধ্যেই। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অন্তত খাবারের টেবিলে ফোন সঙ্গে না নেওয়া। মাত্র ১৫ মিনিট ফোন পাশে রাখলে একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা যায়। তৌহিদা শিরোপার মতে, মনোযোগ দিয়ে না খেলে সম্পর্কের পাশাপাশি হজমের ওপরও প্রভাব পড়ে। যাঁরা ফোন ব্যবহার করেন না, যেমন দাদি বা মা, তাঁদের উপস্থিতিকেও অবহেলা করা হয়। কাজের বাইরে ও জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ফোনের ব্যবহার সীমিত করা এবং একসঙ্গে থাকার সময় ডিভাইস দূরে রাখা গেলে পারিবারিক কথাবার্তা সহজ ও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের নয়, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনেরও প্রশ্ন। প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই ঘরে থেকেও যদি সবাই আলাদা পর্দায় আটকে থাকেন, তাহলে সেই সংযোগ অর্থহীন হয়ে পড়ে। সম্পর্কের যত্ন মানে ডিভাইস কিছুক্ষণ দূরে রেখে একে অপরকে সময় দেওয়া। এই ছোট পরিবর্তনই হতে পারে হারিয়ে যেতে বসা ঘনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনার প্রথম ধাপ।

