জাহাজভাঙা শিল্পকে সর্বোচ্চ দূষণকারী লাল শ্রেণি থেকে কমলা শ্রেণিতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিল্পের মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা ইআইএ করার বাধ্যবাধকতা উঠে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে অনুমোদনের জটিলতা কমবে। কিন্তু পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এর ফলে পরিবেশ ও শ্রমিক, দুটিই বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
জানা গেছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত কমিটি শিল্পটিকে লাল থেকে কমলায় আনার সিদ্ধান্ত নেয়। আগস্টে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসংক্রান্ত আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কমিটিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সভাপতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব এবং আইন ও সংসদবিষয়ক সচিব এর সদস্য। তবে কোনো পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি বা পরিবেশ বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে রাখা হয়নি। এই বিষয়টিই এখন সমালোচনার অন্যতম কেন্দ্র।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও জাহাজভাঙা ইয়ার্ড, দুটিই লাল শ্রেণির শিল্প। বিধিমালায় বলা আছে, লাল শ্রেণির স্থাপনা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে এবং এই প্রভাব মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। বিদ্যমান নিয়মে ইয়ার্ড স্থাপনের জন্য প্রথমে ইআইএ করতে হয়। এটি ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজভাঙা শিল্পের জন্যও বাধ্যতামূলক।
বর্তমান প্রক্রিয়ায় ইয়ার্ডের দূষণ রোধে কী ব্যবস্থা থাকবে, তার বিস্তারিত কার্যপরিধি পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হয়। এরপর শুরু হয় ইআইএর কাজ। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধির নেতৃত্বে এলাকায় জনমত যাচাই হয়, প্রতিবেদন যায় জেলা কার্যালয়ে, সেখান থেকে আবার সদর দপ্তরে যাচাই-বাছাই শেষে অবস্থানগত ছাড়পত্র মেলে। পরের ধাপে পরিদর্শন শেষে দেওয়া হয় পরিবেশগত ছাড়পত্র। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় ৯০ দিন।
কমলা শ্রেণিতে নামিয়ে আনা হলে এই বাধ্যবাধকতা থাকবে না। বিধিমালা অনুযায়ী, কমলা শ্রেণির শিল্পের জন্য প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে হয় পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে। বিভাগীয় কার্যালয় প্রয়োজন মনে করলে ইআইএর সুপারিশ করতে পারবে, তবে তা মানা বাধ্যতামূলক নয়। চূড়ান্ত অনুমোদনও সদর দপ্তরে যেতে হবে না, বিভাগীয় কার্যালয়ই দিতে পারবে। অর্থাৎ যাচাইয়ের ধাপ কমবে এবং সিদ্ধান্ত স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত হয়ে আসবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিধিমালার এই পরিবর্তনের পর একটি ইয়ার্ড কতটা দূষণ করবে এবং পরিবেশে তার প্রভাব কেমন হবে, তা জানার সুযোগ থাকবে না। ফলে এ শিল্পের তদারকব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
উদ্যোক্তাদের যুক্তি, লাল শ্রেণিতে থাকায় ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমোদন পেতে প্রায় ৯০ দিন লাগে, যা তাঁদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড আছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিটি ইয়ার্ডে তাঁরা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তিন মাস অপেক্ষার কারণে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সিদ্ধান্তের ফলে দূষণের ঝুঁকি বাড়বে কি না, এ প্রশ্নে মন্ত্রীর জবাব, পরিবেশ ও শিল্প, দুটোই বাঁচাতে হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান শিল্পটিকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সাড়ে ছয় হাজার জাহাজ ভাঙার উপযোগী হবে। গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়াতে পারলে এর বড় অংশের কাজ বাংলাদেশ পেতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে প্রতিবছর ১৫০ থেকে ২০০ জাহাজ ভাঙা হয়। একটি জাহাজ ভাঙতে সময় লাগে ছয় মাস। এসব ইয়ার্ডে কাজ করেন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক।
তবে পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ আরও গভীর। তাঁরা বলছেন, জাহাজভাঙা উচ্চ ঝুঁকি ও দূষণকারী শিল্প। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) একে সবচেয়ে বিপজ্জনক শিল্প হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ এশিয়ার যেসব সৈকতে জাহাজ ভাঙা হয়, সেখানকার সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, মাটি ও বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বিধিমালা শিথিল করা জাহাজভাঙা দূষণ রোধে চলমান মামলা এবং আদালতের রায় ও আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর অভিযোগ, সিদ্ধান্তের আগে সরকার আদালতকেও কিছু জানায়নি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত আগস্টেই গ্যাস নিঃসরণে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে বলে তাঁর মত।
রিজওয়ানা হাসান আরও বলেন, আগের আমলে কলমের এক খোঁচায় সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমতি দিতে দেখা গেছে। নির্বাচিত সরকারের সময়ে এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কাম্য নয়। তাঁর প্রশ্ন, সেন্ট মার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় সরকার পরিবেশবাদীদের ডেকেছিল, তাহলে জাহাজভাঙার মতো বড় সিদ্ধান্তে কোনো বিশেষজ্ঞ বা পরিবেশকর্মীকে কেন ডাকা হলো না?
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাসেল কনভেনশন অনুযায়ী যে দেশের জাহাজ, তার বর্জ্যের দায়ও সেই দেশের। উন্নত দেশের বর্জ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশে এলে সেই বর্জ্যের দায়দায়িত্ব উন্নত বিশ্বেরই। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশে নিরাপদে জাহাজ ভাঙতে হলে ড্রাইডক ছাড়া বিকল্প নেই। উন্মুক্ত সৈকতে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে এ শিল্পকে সবুজ করা যাবে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রতিপালনই শিল্পটিকে নিরাপদ করার একমাত্র পথ।
সব মিলিয়ে সরকারের সামনে এখন কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন। একদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক বাজারের সম্ভাবনা, অন্যদিকে দূষণ, শ্রমিকের প্রাণ ও আদালতের নির্দেশনা। অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার দাবি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সময় বাঁচাতে গিয়ে যাচাইয়ের ধাপ কমালে শিল্পটির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোই অনিয়ন্ত্রিত থেকে যেতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, নাকি অংশীজন ও আদালতের চাপে পুনর্বিবেচনা করে।

