রাজধানীর গুলিস্তানের শহীদ মতিউর রহমান পার্ক এখন বিনোদন কেন্দ্রের চেয়ে পার্কিং স্টেশনের মতো হয়ে উঠেছে। পার্কের হাঁটার পথ ও খোলা জায়গায় সকাল থেকে মোটরসাইকেল, ভ্যান-রিকশা ও প্রাইভেটকার রাখা হচ্ছে। রাতে সেই জায়গাই হয়ে যায় ভ্যানগাড়ি ও অস্থায়ী দোকানের কাঠামো রাখার গ্যারেজ। ফলে দর্শনার্থীদের চলাচলের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে পার্কের স্বাভাবিক পরিবেশ।
পার্কে মোট ১৩টি রাইড রয়েছে। এর মধ্যে আছে ড্রাগন, হানিসিং, নৌকা, স্লিপার, ডাম্পিং জাম্পিং, ছোট ঘোড়া, প্লেন, হেলিকপ্টার, নাগরদোলা, হাঁস, বল হাউজ, মিনি ট্রেন ও ভুতের বাড়ি। বল হাউজে চড়তে ১০০ টাকা লাগে, বাকি সব রাইডে ৫০ টাকা। পার্কে দেশি প্রজাতির নানা গাছ, একটি শান বাঁধানো পুকুর ও একাধিক ফুড কোর্টও আছে। তবে ভেতরে গেলে পরিবেশ নোংরা, রাইডগুলোর অবস্থাও ভালো নয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাঁটার পথের আশপাশে মোটরসাইকেলের সারি। ভ্যান-রিকশা ও অন্য যানবাহনও একইভাবে রাখা। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের অস্থায়ী টং দোকানের কাঠামোও পার্কের ভেতরে ফেলে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো সময় এসব সারা দিনও পড়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে, পার্কের ভেতরে মোটরসাইকেল রাখতে ৩০ টাকা, ভ্যান-রিকশার জন্য ৩০ টাকা এবং প্রাইভেটকারের জন্য ৫০ থেকে ৮০ টাকা নেওয়া হয়। দিন শেষে এতে বড় অঙ্কের টাকা জমা হয়। তবে এই অর্থ কোথায় যায় এবং এভাবে টাকা নেওয়ার অনুমোদন আছে কি না, তা নিয়ে কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে চাননি।
ফুটপাতের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, তাঁরা দিনে ফুটপাতে ব্যবসা করেন। ব্যবসা শেষে অস্থায়ী দোকানের কাঠামো পার্কের ভেতরে রেখে যান, পরদিন আবার নিয়ে যান। ভ্রাম্যমাণ ভ্যানগাড়ির দোকানও রাতে পার্কে থাকে। অভিযোগ আছে, এর বিনিময়ে কারও কাছ থেকে মাসিক হারে, কারও কাছ থেকে দিনে ৪০ থেকে ৮০ টাকা নেওয়া হয়।
পার্কের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, নিরাপত্তাকর্মীরা কিছু টাকার বিনিময়ে টং দোকান বা মালামাল রাখার অনুমতি দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীও বলেন, মালামাল রাখলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়, যা পার্ক কর্তৃপক্ষের লোকজন নেন। তবে কেউ প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলেননি।
পার্কের টিকিটের দায়িত্বে থাকা রবিন বলেন, গাড়ি ও টং দোকানের জন্য ৪০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার সময় রসিদ দেওয়া হয় কি না, হিসাব কীভাবে রাখা হয় এবং এ ধরনের ব্যবহারের লিখিত অনুমোদন আছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। একাধিক গেটে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কথা বলতে রাজি হননি। পার্কের অফিস কক্ষে কাউকে পাওয়া যায়নি।
এসব অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময় এ নিয়ে লেখালেখি হলেও কোনো প্রভাবশালী মহলের কারণে তা চাপা পড়ে যায় বলে জানা গেছে। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না।
পার্কটি আয়তনে ছোট, তবু ভেতরে একাধিক খাবারের দোকান ও ভাতের হোটেল আছে। সেখানে দর্শনার্থীর পাশাপাশি বাইরের মানুষও খেতে আসেন। দর্শনার্থীরা অভিযোগ করছেন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, যানবাহন ও দোকানের কারণে পার্কের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
আহসান হাবিব নামে এক দর্শনার্থী বলেন, মোবাইল মেরামত করতে গুলিস্তানে এসে অবসরে পার্কে ঘুরতে এসেছিলেন। কিন্তু পরিবেশ ভালো লাগেনি। খাবার হোটেলে বাইরের মানুষ খেতে আসছে, পথে গাড়ি রাখায় হাঁটার জায়গা সরু হয়ে গেছে। তাঁর মতে, পার্কটিকে আরও মানসম্মত করা যায়।
গুলিস্তানের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকায় খোলা জায়গা খুবই কম। তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের কর্মজীবী মানুষের কাছে এই পার্ক গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে সকালে হাঁটতে আসেন। নিয়মিত হাঁটার জন্য মাসিক বা বার্ষিক ফি দিয়ে প্রবেশের সুযোগ আছে। উত্তর গেটে তিনটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট রয়েছে, যেখানে সকালে মধ্যবয়সী ও প্রবীণ নাগরিকেরা খেলেন, যাঁদের বেশির ভাগই পুরান ঢাকার বাসিন্দা। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রবেশ ফি ১০ টাকা। সারা দিন থাকতে চাইলে ৩০ টাকা দিতে হয়।
একসময় এই পার্ক ছিল মাদকসেবীদের আখড়া। অসামাজিক কার্যকলাপের কারণে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলাও কঠিন ছিল। পরে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ‘জল-সবুজে ঢাকা’ প্রকল্পের আওতায় সংস্কারে ব্যয় হয় ৫ কোটি ৬৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা।
সংস্কারের কয়েক বছর পর ২০২১ সালে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য পার্কটি ইজারা দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপর রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ইজারাও বিভিন্ন পক্ষের হাতে গেছে বলে অভিযোগ আছে। ইজারাদারেরা ভেতরে রাইড বসিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
নিরাপত্তা নিয়ে পার্কের গেটম্যান সজল বলেন, আগে ভেতরে চুরি-ছিনতাই হতো, এখন তা নেই। দর্শনার্থীরা নিরাপদে আড্ডা দিতে বা হাঁটতে পারেন। তাঁর ভাষ্য, কোনো ভাসমান ব্যক্তিকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না, টিকিটও বিক্রি করা হয় না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ইজারার শর্তের বাইরে পার্কে কোনো কার্যক্রম চলার কথা নয়। কোথাও অবৈধ পার্কিং বা অনিয়ম থাকলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। তিনি জানান, মুক্তাঙ্গনেও আগে অভিযান চালিয়ে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করা হয়েছে। সেখানে আবার অবৈধ পার্কিং হলে অভিযান অব্যাহত থাকবে। মোটরসাইকেল ও ভ্যান পার্কিং এবং মালামাল স্তূপ করে রাখার বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে লোক পাঠাবেন।
পার্কটি ইজারার শর্ত মেনে চলছে কি না এবং পার্কিং ও দোকানের নামে আদায় করা অর্থের হিসাব কোথায় যাচ্ছে, তা এখন সিটি করপোরেশনের তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা। অভিযানের ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ

