জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে সফল ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তাঁর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই সফরে নতুন সরকারের অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা গেছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, সম্মান ও আত্মমর্যাদা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান। চার দিনের সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকায় পৌঁছান তিনি।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। নতুন সরকারের জন্য এটি ছিল সাধারণ পরিষদে প্রথম অংশগ্রহণ। প্রধানমন্ত্রীও প্রথমবার এ মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্য দিয়ে একই পরিবারের দুই প্রজন্মের তিনজন প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় দেশের মর্যাদা আরও বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল সাধারণ পরিষদে একটি ভাষণ, সাতটি উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য, ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাতিসংঘসহ ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক।
২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্ক পর্বে প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তব্য দেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, ওই বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং দেশ পুনর্গঠনে সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশলের কথা তুলে ধরেন। এই তিন আর হলো রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন। নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিষয়ও ভাষণে ছিল। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
একই বক্তব্যে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় সংলাপ ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির গুরুত্বের কথাও বলেন তিনি। শান্তি ও নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণে বাংলাদেশের অঙ্গীকারও নতুন করে জানান প্রধানমন্ত্রী।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু পরিবর্তন ও ন্যায্য রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিন বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক বৈঠকেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি চারটি বিষয়ে আহ্বান জানান। এগুলো হলো রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, মিয়ানমারে সহিংসতার অবসান, রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তুরস্ক ও ইরানের রাষ্ট্রপতি, মালদ্বীপের উপ-রাষ্ট্রপতি, ভুটান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী, বোয়িং গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও সাক্ষাৎ হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
হুমায়ুন কবির বলেন, সার্বিক বিবেচনায় এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সার্থক হয়েছে। বিভিন্ন সভা ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেওয়া অতিথিরা বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, সম্মান ও আত্মমর্যাদা নতুন উচ্চতায় তুলে ধরেছেন।
তবে সফরের সাফল্য ও সমর্থনের এসব বর্ণনা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া। বৈঠকগুলো থেকে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি এসেছে কি না, সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানা যায়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ আলোচিত বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

