দেশের বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত ৬৮ জন সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) একসঙ্গে প্রত্যাহার করেছে সরকার। তাঁদের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে ন্যস্ত করা হয়েছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-১ শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রত্যাহার হওয়া সবাই বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা। তাঁরা নিজ নিজ উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এখন তাঁদের পদ থেকে সরিয়ে পরবর্তী পদায়নের জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং অবিলম্বে কার্যকর হবে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে।
ন্যস্ত করার তালিকায় আছে আটটি বিভাগের কার্যালয়। এগুলো হলো বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, ঢাকা ও রংপুর। অর্থাৎ পুরো দেশজুড়েই এই আদেশের প্রভাব পড়েছে, কোনো একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রজ্ঞাপনে প্রতিটি কর্মকর্তার নাম, পরিচিতি নম্বর, বর্তমান কর্মস্থল এবং কোন বিভাগে ন্যস্ত করা হলো, সেই তথ্য দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের এই তথ্য বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এবং গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে হালনাগাদ করার নির্দেশনাও রয়েছে।
এই আদেশের প্রভাব বুঝতে উপজেলা পর্যায়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদের ভূমিকা দেখা দরকার। সাধারণত তিনি উপজেলার ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রধান কর্মকর্তা। নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, খাসজমির ব্যবস্থাপনা ও ভূমিসংক্রান্ত নানা সেবা তাঁর তত্ত্বাবধানে চলে। ফলে পদটি হঠাৎ ফাঁকা হলে সাধারণ মানুষের ভূমিসেবায় কিছু সময়ের জন্য ভোগান্তি তৈরি হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়নি, প্রত্যাহারের পর সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর দায়িত্ব কে সামলাবেন। বিকল্প কর্মকর্তা দেওয়া হয়েছে কি না, দিলে কবে নাগাদ, সে তথ্যও নেই। এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ ৬৮টি উপজেলায় একসঙ্গে দায়িত্বে ফাঁক পড়লে সেবাপ্রার্থীদের কাজ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ায় সেই ঝুঁকি আরও বাড়ে। অবশ্য নতুন পদায়ন দ্রুত হলে সমস্যা সাময়িক হয়ে যেতে পারে।
সংখ্যার দিক থেকেও ঘটনাটি লক্ষণীয়। দেশে উপজেলার সংখ্যা প্রায় ৪৯৫। সেই হিসাবে ৬৮ জন মানে প্রায় ১৪ শতাংশ উপজেলার ভূমি কর্মকর্তা একসঙ্গে সরে গেলেন। এটি ছোটখাটো রদবদল নয়, বড় পরিসরের একটি পদক্ষেপ।
প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের কারণ স্পষ্ট করা হয়নি। কেবল বলা হয়েছে, আদেশটি জনস্বার্থে জারি করা। মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন সাধারণত একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই এটি নিয়মিত পুনর্বিন্যাসের অংশ হতে পারে। তবে এত বড় সংখ্যায় একসঙ্গে প্রত্যাহারের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো প্রশাসনিক পরিকল্পনা বা অন্য কারণ আছে কি না, তা এই প্রজ্ঞাপন থেকে বোঝা যায় না। তাই কারণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
আরেকটি লক্ষণীয় দিক পদবির পরিবর্তন। প্রত্যাহারের পর কর্মকর্তাদের সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে ন্যস্ত করা হয়েছে। তবে এটি পদোন্নতির ফল কি না, কিংবা শুধু পরবর্তী পদায়নের অপেক্ষায় থাকার অস্থায়ী ব্যবস্থা কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। এই ফারাক জানা গেলে আদেশের চরিত্র আরও পরিষ্কার হতো।
সব মিলিয়ে সামনে দুটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। প্রথমত, ফাঁকা হওয়া উপজেলাগুলোতে নতুন কর্মকর্তা কত দ্রুত যোগ দেন। দ্বিতীয়ত, ন্যস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের নতুন পদায়ন কী হয়। এই দুই ধাপ সম্পন্ন হলেই বোঝা যাবে, আদেশটি কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল ছিল, নাকি এর পেছনে বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে।

