ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা শুধু গরিবের জন্য নয়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীও এর আওতায় আসবেন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এ কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, আগামী চার বছরে দেশের চার কোটি পরিবারের প্রত্যেক নারীপ্রধানকে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে তিনি কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের নানা পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন।
আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রংপুরের পীরগঞ্জে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, কর্মসূচিটি শুরু হয়েছে একেবারে হতদরিদ্রদের দিয়ে। এরপর ক্রমান্বয়ে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা এর আওতায় আসবেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামের স্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমানও কার্ড পাবেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি নিজের স্ত্রী, উপস্থিত জেলা পরিষদ প্রশাসকের স্ত্রী, নারী সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকের কথাও বলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সর্বজনীন মানে সবার জন্য, একটি পরিবারও বাদ যাবে না। এটি হাসির কথা নয়, বোঝানোর জন্য উদাহরণ দিয়েছেন মাত্র। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্যে, এটি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত।
কৃষক কার্ড নিয়েও একই ধরনের কথা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এটিও সবার জন্য। তালিকাভুক্তির কাজ চলছে। প্রথম পর্যায়ে চার বছরের মধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়া হবে। বিতরণ হবে ভূমিহীন, প্রান্তিক, মধ্যম ও উচ্চ, এই চার স্তরের ক্রম অনুযায়ী। যাঁদের ৫০ বা ১০০ বিঘা জমি আছে, তাঁরাও সুবিধা পাবেন। কার্ডের জন্য কাউকে তদবির করতে হবে না বলেও তিনি জানান।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িতদের জন্যও পরিকল্পনার কথা বলেছেন তিনি। দেশের সাড়ে তিন লাখ মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম এবং মন্দির, প্যাগোডাসহ অন্যান্য উপাসনালয়ের ধর্মগুরুদের চার বছরের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মানী ভাতা দেওয়া হবে। কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরুও হয়েছে। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ভাতার টাকা সরাসরি তাঁদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে পৌঁছাবে।
এ প্রসঙ্গে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সমালোচনাও করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দলটি কখনো ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কথা ভেবেছে কি না, এ নিয়ে দাবি তুলেছে কি না কিংবা নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছে কি না। তবে দলটির নাম তিনি উল্লেখ করেননি।
স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া নিয়ে তিনি বলেন, এক লাখ স্বাস্থ্য আপা নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেবেন, ওষুধ ও চিকিৎসা দেবেন। শিশুদের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও আছে।
কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৃতীয় ভাষা শেখানো হবে। তৃতীয় ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বেকার মানুষদের বিপুল সংখ্যায় বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এই এলাকার সন্তানেরাও বিদেশে যাবে, আর এটাই বর্তমান সরকারের কর্মসূচি।
সফরে তিনি আবু সাঈদের পৈতৃক বাড়ি, আবু সাঈদ ফাউন্ডেশন ও কবরস্থানের অবকাঠামো সম্প্রসারণে এক কোটি টাকা বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেন। পরে রংপুর জেলা পরিষদকে তা বাস্তবায়নের নির্দেশনাও দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেজেকা সুলতানা ফেন্সী, জেলা পরিষদ প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ইসরাত সুলতানা এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো সর্বজনীনতার ধারণা। দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সাধারণত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে লক্ষ্য করে সাজানো হয়। এখানে বলা হচ্ছে, উচ্চবিত্ত পরিবারও বাদ যাবে না। এর সুবিধা ও ঝুঁকি দুটিই আছে। সুবিধা হলো, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করলে প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়ার ভুল কমে যায়। তালিকা তৈরিতে পক্ষপাত বা তদবিরের সুযোগও কমে। প্রতিমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, কার্ডের জন্য তদবির করতে হবে না। ঝুঁকি হলো ব্যয়। যত বেশি মানুষ সুবিধা পাবেন, সরকারের খরচ তত বাড়বে। আর সীমিত সম্পদের দেশে সবাইকে সমান সুবিধা দিলে যাঁর প্রয়োজন বেশি, তাঁর জন্য বরাদ্দ কমে যেতে পারে।
এই ব্যয়ের প্রশ্নই সবচেয়ে বড়। প্রতিবেদনে প্রতিটি কার্ডে কত টাকার সুবিধা মিলবে, সুবিধা নগদ না পণ্য, আর মোট খরচ কত হবে, তার কোনো উল্লেখ নেই। এসব ছাড়া কর্মসূচির টেকসই হওয়ার প্রশ্নে সিদ্ধান্তে যাওয়া কঠিন। সরকার আয় বাড়িয়ে এই ব্যয় মেটাবে, নাকি অন্য খাত থেকে বরাদ্দ সরাবে, সেটিও এখনো অস্পষ্ট। রাজস্ব আদায়ের চাপ ও বৈদেশিক ঋণের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও প্রাসঙ্গিক।
সংখ্যার হিসাবেও কাজের পরিধি বোঝা যায়। চার কোটি পরিবারকে চার বছরে কার্ড দিলে গড়ে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কৃষক কার্ডে ২ কোটি ১০ লাখ কৃষককে চার বছরে ধরলে বছরে গড়ে প্রায় ৫২ লাখ। এই হারে তালিকা তৈরি, যাচাই ও বিতরণ বড় প্রশাসনিক কাজ। ভুয়া তালিকা, অযোগ্যদের অন্তর্ভুক্তি ও দুর্নীতির ঝুঁকি এখানে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিমন্ত্রী কার্ডের জন্য তদবিরের প্রয়োজন হবে না বলেছেন, কিন্তু তালিকা কীভাবে তৈরি হবে এবং কে যাচাই করবেন, তা জানাননি।
কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, ৫০ বা ১০০ বিঘা জমির মালিকেরাও কার্ড পাবেন। কিন্তু কার্ডের মাধ্যমে ঠিক কী সুবিধা মিলবে, তা না জানলে বোঝা যায় না, বড় জমির মালিকদের অন্তর্ভুক্তি কতটা যুক্তিসংগত। সার, বীজ বা ভর্তুকিভিত্তিক সুবিধা হলে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকের অগ্রাধিকার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মগুরুদের ভাতার উদ্যোগ প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সাড়ে তিন লাখ মসজিদের কর্মীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের গুরুদের কথাও বলা হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তির বার্তা দেয়। ভাতা সরাসরি মোবাইল অ্যাকাউন্টে গেলে মধ্যস্থতাকারীর সুযোগ কমে। তবে ভাতার পরিমাণ, তালিকা তৈরির মানদণ্ড এবং ছোট ও অনিবন্ধিত উপাসনালয়ের কর্মীরা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবেন, সেটি প্রতিবেদনে নেই। এ ছাড়া ধর্মভিত্তিক দলের নাম না নিয়ে সমালোচনা করায় অভিযোগের ভিত্তি যাচাই করা যাচ্ছে না। তাই এই অংশটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত।
কর্মসংস্থানের ঘোষণায় একটি সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। প্রতিবেদনে প্রতিমন্ত্রীর উদ্ধৃতিতে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য হিসেবে “লক্ষ কোটি” মানুষের কথা এসেছে। আক্ষরিক অর্থে এটি এক লাখ কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার বহু গুণ, তাই বাস্তবসম্মত নয়। সম্ভবত বলার সময় সংখ্যায় ভুল হয়েছে, অথবা তিনি লাখ লাখ মানুষের কথা বুঝিয়েছেন। প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা কত, তা সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে তৃতীয় ভাষা শেখানো ও দক্ষতা উন্নয়নের ধারণা অভিবাসন খাতের জন্য প্রাসঙ্গিক। বিদেশে কাজের বাজারে ভাষাজ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা থাকলে শ্রমিকেরা ভালো মজুরির কাজ পান। কিন্তু কোন ভাষা শেখানো হবে, কোন দেশের বাজার লক্ষ্য হবে এবং কারা পড়াবেন, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
স্বাস্থ্য আপা নিয়োগের ঘোষণা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর দিক থেকে ইতিবাচক হতে পারে। এক লাখ কর্মী প্রতিটি ইউনিয়ন বা গ্রামে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ পৌঁছানো সহজ হবে। তবে তাঁদের প্রশিক্ষণ, বেতন ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা কেমন হবে, তা প্রতিবেদনে নেই। দক্ষতা ছাড়া নিয়োগ হলে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সব ঘোষণারই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। প্রায় সবগুলোর সময়সীমা চার বছর। এতে মনে হয়, সরকার একটি মেয়াদের মধ্যেই এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রেখেছে। সময়সীমা ঠিক করে দেওয়া দায়বদ্ধতার দিক থেকে ভালো, কারণ পরে অগ্রগতি মাপা যায়। কিন্তু বছরওয়ারি লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের কাঠামো না থাকলে এই সময়সীমা কেবল প্রতিশ্রুতি হয়েই থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি স্পষ্ট বার্তা আছে। সরকার সামাজিক সুরক্ষাকে সীমিত গোষ্ঠীর বদলে সর্বজনীন করতে চায়। তবে ঘোষণার বিস্তারিত রূপ, ব্যয়, উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি ও বাস্তবায়নের ধাপ এখনো সামনে আসেনি। আগামী বাজেট, কার্ড বিতরণের প্রথম ধাপ ও তালিকা প্রকাশের পদ্ধতিই বলে দেবে, এই প্রতিশ্রুতি কতটা কাজে রূপ নিচ্ছে।

