উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি কক্সবাজারের আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন। ফলে প্রতিশ্রুত নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রীরা। অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্টেশন কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অংশ ইতিমধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে। জনবল সংকট ও বেসরকারি অপারেটর নিয়োগে ব্যর্থতাকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০১ কিলোমিটার রেলপথ, ৩৮টি সেতু ও নয়টি স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। পরের মাসে নতুন রেলপথে ট্রেন চালু হলে পর্যটন নগরী কক্সবাজার প্রথমবারের মতো দেশের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই প্রকল্পের অধীনে সমুদ্রসৈকতের কাছে ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দের পাড়ায় ২১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৯ একর জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে ঝিনুক আকৃতির আইকনিক স্টেশন। ছয়তলা ভবনটির আয়তন ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এই স্টেশনের দৈনিক ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার মানুষ। সেখানে আছে তারকা মানের হোটেল, শপিংমল, রেস্তোরাঁ, শিশুযত্ন কেন্দ্র, লাগেজ রাখার লকার, ডাকঘর, কনভেনশন সেন্টার, তথ্যকেন্দ্র, এটিএম বুথ ও প্রার্থনার জায়গা।
ভবনের নিচতলায় টিকিট কাউন্টার, অভ্যর্থনা কক্ষ, লকার, মসজিদ, শিশুদের বিনোদনের জায়গা ও যাত্রী লাউঞ্জ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় ওয়েটিং রুম, শপিংমল ও রেস্তোরাঁ। তৃতীয় তলায় ৩৯ কক্ষের হোটেল। চতুর্থ তলায় রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স হল ও কর্মকর্তাদের কার্যালয়। পঞ্চম তলায় অফিস এবং ষষ্ঠ তলায় মাল্টিপারপাস হলের অবকাঠামো আছে।
এত আয়োজনের পরও বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। যাত্রীদের জন্য ওয়েটিং রুম ও বিশ্রাম কক্ষের মতো ন্যূনতম সেবাও চালু হয়নি। নিচতলায় শুধু বসার জন্য কিছু চেয়ার বসানো হয়েছে। স্টেশনের দায়িত্বে থাকা এক রেল কর্মচারী জানান, যাত্রীদের মৌলিক সেবার বেশির ভাগই এখনো চালু হয়নি।
ব্যবহার শুরু না হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণও হচ্ছে না। গত দুই বছরে স্টিলের কাঠামো ও বিভিন্ন ফিটিংসে ধুলোর আস্তর জমেছে, কিছু অংশে মরিচা ধরেছে। টয়লেট ও ফিটিংস নষ্ট হচ্ছে। চলন্ত সিঁড়িতেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। স্টেশনের প্রধান আকর্ষণ ঝিনুকের পাইপেও মরিচা ও শ্যাওলা পড়েছে। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পর্যাপ্ত তদারকি না থাকলে মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি এবং অবকাঠামোর আরও ক্ষতি হতে পারে।
জনবলের সংকটই এখানে বড় সমস্যা। বর্তমানে চারজন স্টেশনমাস্টার, চারজন বুকিং সহকারী, পাঁচজন টিকিট কালেক্টর, তিনজন পোর্টার, ১২ জন পয়েন্টসম্যান ও ছয়জন গেটকিপার দিয়ে স্টেশন চলছে। নিরাপত্তায় আছেন আটজন রেলওয়ে পুলিশ ও ১২ জন রেলওয়ে সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্য। রেলওয়ের হিসাবে, প্রয়োজনীয় জনবলের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ কর্মী এখন আছে। সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে দায়িত্বরতরা পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ জনবলের অভাব এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা জানান। আধুনিক সুবিধা থাকলেও সেগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না থাকায় স্টেশন পুরোপুরি উন্মুক্ত করা যায়নি।
ট্রেন চলাচলের চিত্রও পরিকল্পনার সঙ্গে মেলে না। দোহাজারী-কক্সবাজার পথে দৈনিক ৩১ জোড়া ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা ছিল। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে চলছে মাত্র চার জোড়া। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর এক্সপ্রেস কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটের মেঘনা এক্সপ্রেসও কক্সবাজার পর্যন্ত চালানোর কথা আছে।
জনবলের অনুমোদন না মেলায় স্টেশন পরিচালনা বেসরকারি খাতে দিতে চেয়েছিল রেলওয়ে। এ জন্য চলতি বছরের শুরুতে দরপত্র ডাকা হয়। আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও বাণিজ্যিক শর্ত ব্যবসাবান্ধব নয় বলে কেউ জমা দেয়নি। কারণ জানতে এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে রেলওয়ে।
প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, রেলওয়ে ৫০০ জনবল নিয়োগ এবং নির্ধারিত যন্ত্রপাতি কেনার শর্ত দিয়েছে। তাদের হিসাবে এ জন্য অপারেটরকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। অথচ স্টেশন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে অন্তত দুই বছর লাগতে পারে। চুক্তির মেয়াদ ১২ বছর হওয়ায় এত বড় বিনিয়োগ উঠে আসবে কি না, সে বিষয়েও তাদের সংশয় ছিল। পাশাপাশি পাঁচ কোটি টাকা অফেরতযোগ্য অগ্রিম এবং ১৫ কোটি টাকার পারফরম্যান্স সিকিউরিটি আটকে রাখার শর্তে আপত্তি জানায় তারা। যুক্তি ছিল, ব্যাংকঋণ নিয়ে এই অর্থ বিনিয়োগ করলে সেই অনুপাতে মুনাফা হবে না।
প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রিম ও জামানতের শর্ত শিথিল, বিলম্বে ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জরিমানা কমানো, চুক্তি বাতিলের ধারা নমনীয় করা এবং মেয়াদ ১২ থেকে ২০ বছর করার প্রস্তাব দেয়। এসব বিবেচনায় নিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় দরপত্র ডাকা হয়েছে। নতুন শর্তে অফেরতযোগ্য অগ্রিম পাঁচ কোটি থেকে কমিয়ে এক কোটি টাকা এবং পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ১৫ কোটি থেকে কমিয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০ বছর।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম বলেন, লোকবল থাকলে স্টেশনটি রেলওয়ে নিজেই চালাতে পারত। কিন্তু নতুন রুটের জনবল এখনো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়নি। তাই বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের জন্য দরপত্র ডাকা হয়েছিল। এবার শর্ত শিথিল করায় তিনি আশা করছেন, অপারেটর নিয়োগ দেওয়া যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শত কোটি টাকার একটি অবকাঠামো বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকা শুধু অপচয় নয়, পর্যটন সম্ভাবনারও ক্ষতি। কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ বেশি থাকলেও রেলের পূর্ণ সুবিধা মিলছে না। জনবল অনুমোদনের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বেসরকারি অপারেটরই এখন একমাত্র ভরসা। কিন্তু দ্বিতীয় দফার দরপত্রেও কেউ সাড়া না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়, নতুন শর্তে অপারেটর মেলে কি না এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কত দ্রুত জনবলের অনুমোদন দেয়।

