ময়লা-আবর্জনার সমস্যা জানাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ‘ক্লিন কেয়ার’ অ্যাপে দুই মাসে জমা পড়েছে ১ হাজার ৪৬১টি অভিযোগ। এর মধ্যে ১ হাজার ২০টির সমাধান হয়েছে। বাকি ৪৪১টি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় আছে। সিটি করপোরেশনের দাবি, অ্যাপটি নাগরিক সেবায় ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
করপোরেশন সূত্র জানায়, অ্যাপটি ৭ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ১ আগস্ট থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অভিযোগগুলো পাওয়া গেছে। অ্যাপের মাধ্যমে নগরবাসী পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত সমস্যা সহজে কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারছেন। অভিযোগ আসার পর তা সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সেবা নেওয়া ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্টির গড় হার ৫-এর মধ্যে ৪ দশমিক ৫। ৮৯ শতাংশ ব্যবহারকারী অ্যাপের সেবা নিয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। করপোরেশন মনে করে, অল্প সময়ে এমন সাড়া প্ল্যাটফর্মটির কার্যকারিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবায় নগরবাসীর অংশগ্রহণের প্রতিফলন। তাদের দাবি, এতে পরিচ্ছন্নতা সেবায় জবাবদিহি ও গতি বেড়েছে, অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও সহজ হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগের পাশাপাশি নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। ক্লিন কেয়ার অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকদের মতামত ও পরামর্শ নিয়ে পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও আধুনিক ঢাকা গড়ার চেষ্টা চলবে। অ্যাপে আস্থা রাখায় তিনি নগরবাসীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে করপোরেশনের অন্যান্য সেবাও এই অ্যাপের আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে।
বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির অংশ হিসেবে জবাবদিহিমূলক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
সংখ্যাগুলো একসঙ্গে দেখলে অ্যাপের কাজের একটি স্পষ্ট চিত্র মেলে। মোট ১ হাজার ৪৬১ অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ২০টি নিষ্পত্তি হয়েছে, যা প্রায় ৭০ শতাংশ। বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৪১টি অভিযোগ এখনো ঝুলে আছে। দুই মাসের নতুন একটি ব্যবস্থার জন্য সাত-দশমাংশ অভিযোগের সমাধান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তবে প্রতি ১০ জনে ৩ জন নাগরিক এখনো সাড়া পাননি, এটিও উপেক্ষার নয়। বিশেষ করে ময়লার সমস্যা সময়ের সঙ্গে বাড়ে। সমাধানে দেরি হলে দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই ৪৪১টি অভিযোগ কতদিন ধরে অপেক্ষায় আছে, সে তথ্য প্রতিবেদনে নেই। এটি জানা গেলে ব্যবস্থার প্রকৃত কার্যকারিতা বোঝা যেত। কারণ নিষ্পত্তির হারের চেয়ে নিষ্পত্তির গতি অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি অভিযোগ দুই দিনে মিটলে নাগরিক স্বস্তি পান, দুই সপ্তাহ লাগলে ভরসা কমে যায়। অ্যাপের ভেতরে অভিযোগ মেটানোর গড় সময় কত এবং অভিযোগ কী ধরনের, যেমন ময়লা ফেলার স্থান, ঝাড়ু না দেওয়া বা ড্রেনের আবর্জনা, তা প্রকাশ করলে স্বচ্ছতা বাড়ত।
অভিযোগের সংখ্যাটিও একটু খতিয়ে দেখা দরকার। ১ আগস্ট থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর প্রায় ৫৯ দিন। সেই হিসাবে গড়ে দিনে প্রায় ২৫টি অভিযোগ এসেছে। ঢাকা দক্ষিণের মতো বিশাল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার জন্য এটি খুব বড় সংখ্যা নয়। এর অর্থ দুটি হতে পারে। হয়তো নগরবাসীর অনেকে এখনো অ্যাপটির কথা জানেন না। কিংবা যাঁরা জানেন, তাঁদের সবাই অভিযোগ জানাতে অ্যাপে আসছেন না। প্রতিবেদনে ডাউনলোডের সংখ্যা বা সক্রিয় ব্যবহারকারীর তথ্য নেই, তাই কোন ব্যাখ্যা সঠিক, তা বলা যাচ্ছে না। তবে সংখ্যাটি ইঙ্গিত দেয়, প্রচার ও সচেতনতার কাজ এখনো বাকি।
সন্তুষ্টির পরিসংখ্যানেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। ৫-এর মধ্যে ৪ দশমিক ৫ মানে ৯০ শতাংশ, আর ৮৯ শতাংশের ইতিবাচক মতামত প্রায় একই চিত্র দেয়। সংখ্যা দুটি ভালো। কিন্তু এই মূল্যায়ন কতজন দিয়েছেন, তা জানানো হয়নি। সাধারণত যাঁদের অভিযোগ মিটেছে, তাঁরাই মূল্যায়ন দেন। যাঁদের অভিযোগ ঝুলে আছে বা যাঁরা হতাশ হয়ে অ্যাপ ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁদের মতামত হয়তো এতে আসে না। তাই এই সন্তুষ্টির হার সমাধান পাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা, সব ব্যবহারকারীর নয়, এমন হতে পারে। স্বতন্ত্র কোনো জরিপ ছাড়া নগরবাসীর সামগ্রিক সন্তুষ্টি বোঝা কঠিন। উল্লেখ্য, সন্তুষ্টির সব তথ্যই করপোরেশনের নিজস্ব সূত্রের, কোনো স্বাধীন সংস্থা তা যাচাই করেছে কি না, প্রতিবেদনে তা বলা নেই।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জবাবদিহি। আগে নাগরিকদের অভিযোগ জানাতে ফোন করতে হতো বা কার্যালয়ে যেতে হতো। অভিযোগ কোথায় গেল, কে দেখছেন, তার কোনো হিসাব থাকত না। অ্যাপে অভিযোগ নথিভুক্ত হয়, বিভাগে পাঠানো হয় এবং নিষ্পত্তির অবস্থা গণনা করা যায়। ফলে করপোরেশন এখন নিজের কাজের হিসাব দিতে পারছে। এই হিসাব থাকলেই জবাবদিহির পথ খোলে। কোন এলাকায় অভিযোগ বেশি, কোন বিভাগ ধীর, কোথায় সমস্যা বারবার ফিরে আসছে, এই তথ্য ব্যবহার করে করপোরেশন সম্পদ বণ্টন আরও যুক্তিসংগত করতে পারে। অভিযোগের এলাকাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে বর্জ্য সংগ্রহের পথ ও সময়সূচিও উন্নত করা সম্ভব।
তবে অ্যাপনির্ভর ব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। এতে কেবল স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরাই অভিযোগ জানাতে পারেন। নিম্নআয়ের মানুষ, বয়স্ক বা প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত নন এমন বাসিন্দারা পিছিয়ে পড়তে পারেন। অথচ বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বর্জ্যের সমস্যা প্রায়ই সবচেয়ে বেশি। অভিযোগ যদি কেবল সচেতন ও প্রযুক্তি-সক্ষম এলাকা থেকে আসে, তাহলে করপোরেশনের মনোযোগও সেদিকেই ঝুঁকতে পারে। এ কারণে অ্যাপের পাশাপাশি ফোন, হটলাইন বা ওয়ার্ড কার্যালয়ের মতো বিকল্প মাধ্যমও সক্রিয় রাখা জরুরি। প্রতিবেদনে অন্য মাধ্যমের কথা বলা হয়নি।
প্রশাসক ভবিষ্যতে অন্যান্য সেবাও অ্যাপের আওতায় আনার কথা বলেছেন। এটি সম্ভাবনাময় পরিকল্পনা। তবে সেবার পরিধি বাড়ানোর আগে বর্তমান ৪৪১টি ঝুলে থাকা অভিযোগ মেটানো এবং নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া দরকার। নতুন সেবা যুক্ত হলে অভিযোগের সংখ্যাও বাড়বে। ব্যবস্থা প্রস্তুত না থাকলে ঝুলে থাকা অভিযোগের বোঝা আরও ভারী হবে। কোন সেবা, কবে, কীভাবে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো সময়সীমা বা বিস্তারিত নেই।
সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির সঙ্গে জুড়ে দেওয়ায় উদ্যোগটির রাজনৈতিক গুরুত্বও স্পষ্ট। স্বল্প সময়ের কর্মসূচিতে দৃশ্যমান ফল দেখানোর চাপ থাকে। সে কারণে সংখ্যা ও সন্তুষ্টির হার সামনে আনা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য মাপা হবে ঢাকা শহরের বাস্তব পরিচ্ছন্নতা দিয়ে, অ্যাপের পরিসংখ্যান দিয়ে নয়। রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ কমছে কি না, ড্রেন পরিষ্কার থাকছে কি না এবং বর্জ্য নিয়মিত সরানো হচ্ছে কি না, সেটিই আসল পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে ক্লিন কেয়ার অ্যাপ একটি ভালো শুরু। অভিযোগ গ্রহণ, নথিভুক্তি ও নিষ্পত্তির একটি দৃশ্যমান কাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে তিনটি বিষয় এখনো অস্পষ্ট। ঝুলে থাকা অভিযোগ কতদিনের, ব্যবহারকারীর সংখ্যা কত এবং সন্তুষ্টির হার কতজনের মতামতে তৈরি। আগামী কয়েক মাসে নিষ্পত্তির গড় সময়, অভিযোগ বৃদ্ধির হার এবং নতুন সেবা যুক্ত হওয়ার অগ্রগতি দেখলেই বোঝা যাবে, উদ্যোগটি কেবল শুরুর উচ্ছ্বাস, নাকি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা।

