আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হবে। একই সঙ্গে দেশে পাঁচটি রোবটিক সার্জারি মেশিন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন শনিবার ময়মনসিংহে এ তথ্য জানিয়েছেন। ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি মেশিন সরবরাহ, চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ এবং উপজেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের কথাও বলেছেন তিনি।
শনিবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এত দিনের সমস্যা এক দিন বা এক মাসে মেটানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। হাসপাতালের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও চলছে বলে জানান তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। একজন চিকিৎসক যেখানে ৫০ জন রোগী দেখতে পারেন, সেখানে তাঁকে দেখতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ জন। এতে চিকিৎসকেরা হাঁপিয়ে যান এবং কাজের মান ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে তিনি জানান, চিকিৎসাসেবায় গাফিলতি থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিদর্শনের সময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েকজন চিকিৎসককে অনুপস্থিত পাওয়া গেছে বলে জানান মন্ত্রী। তাঁদের রোস্টার তালিকা সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। যাচাই শেষে অনুপস্থিতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেসরকারি খাত নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিক স্থাপন করা যাবে না। বেসরকারি ক্লিনিক নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো ক্লিনিকে লেবার রুম না থাকলে, রোগীর চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা হলে কিংবা যথাযথ সেবা না পেয়ে রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শর্ত না মানলে সেসব ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এর আগে সকালে মন্ত্রী ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। ফুলপুরে অব্যবস্থাপনা ও ময়লা-আবর্জনা দেখে আগামী দুই দিনের মধ্যে বাথরুম সংস্কার ও পরিষ্কারের নির্দেশ দেন। তারাকান্দা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখনো ইনডোর সেবা চালু হয়নি। মন্ত্রী জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে এই সেবা চালু করা হবে। দুটি কমপ্লেক্সকেই ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে ডায়ালাইসিস, ফিজিওথেরাপি, মাতৃসেবা ও শিশুদের জন্য আলাদা শয্যা থাকবে। এসব হাসপাতালের উন্নয়ন হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে বলে তাঁর আশা।
স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়াতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি পাঁচ হাজার চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ চলছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা বাড়াতে পুরোনো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে ফ্যামিলি ওয়েলবিং সেন্টারে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চিকিৎসক-রোগীর অনুপাতের যে বাস্তবতা মন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তা দেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সংকট। বড় অঙ্কের টেন্ডার ও আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রতিশ্রুতি আশা জাগালেও এর সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং যন্ত্রপাতি চালানোর দক্ষ জনবলের ওপর। একই সঙ্গে ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণ ও অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ঘোষিত ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেও নজর থাকবে।

