সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্যের ম্যুরাল সরিয়ে সেখানে ফোয়ারা নির্মাণের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেছেন, এ নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদ ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
এদিন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকেরা জানতে চান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণের ম্যুরালের জায়গায় ফোয়ারা বসানো হচ্ছে কি না।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, কয়েক দিন আগে একটি অনলাইন পত্রিকায় এ বিষয়ে ভুলভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ কীভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেটি নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের যে পরিকল্পনা ছিল, তার জায়গায় ফোয়ারা বসানো নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি।
মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওই স্থানে কী করা যায়, তা নিয়ে একটি আলোচনা হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার স্বাধীনতা স্তম্ভের মূল চেতনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ীই এ বিষয়ে ভাবনা চলছে বলে জানান তিনি।
পত্রিকায় প্রকাশিত ফোয়ারার খবরকে তিনি ‘একদম সঠিক নয়’ বলে অভিহিত করেন। মন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে আগেই একটি অবস্থানপত্র বা স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে। সেখানেই মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য স্পষ্ট করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান নকশা অপরিবর্তিত আছে কি না, এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে এখনো মন্ত্রণালয়ে কাজ শুরু হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয়ভাবে ভাবা হচ্ছে। কারণ, প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় আছে। নকশা অপরিবর্তিত না পরিবর্তিত, এ নিয়ে পত্রিকায় যে মন্তব্য এসেছে, তা সঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন। ভবিষ্যতে কী হবে, তা সময়ই দেখাবে বলে জানান তিনি।
ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বিষয়ে শুধু সৌজন্য বিনিময় হয়েছে। এর বাইরে কোনো আলোচনা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়েও হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা হয়নি বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা তাঁর মুখপাত্রই কথা বলবেন।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট। প্রথমত, আত্মসমর্পণের ম্যুরাল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী দৃশ্যের সঙ্গে জড়িত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই উদ্যানেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। তাই এর পরিবর্তন বা অপসারণের যেকোনো খবর স্বাভাবিকভাবেই জনমনে স্পর্শকাতর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। মন্ত্রীর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যে সেই উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মন্ত্রী সিদ্ধান্ত হয়নি বলেছেন, কিন্তু নকশা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্ট করেননি। ‘যা হবে, ভবিষ্যতে দেখা যাবে’ ধরনের বক্তব্য প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর দেয় না। স্বাধীনতা স্তম্ভের কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে এবং এতে আত্মসমর্পণের দৃশ্য কীভাবে থাকবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা জানালে বিভ্রান্তি আরও কমত।
তৃতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের আলোচনার উল্লেখ প্রসঙ্গটিকে রাজনৈতিক মাত্রাও দিয়েছে। কোন সরকারের সময় কী প্রস্তাব ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে। তাই প্রকল্পের নকশা ও সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া প্রকাশ্যে জানানো হলে জনআস্থা বাড়বে।
চতুর্থত, গণমাধ্যমের দায়িত্বের প্রশ্নও এখানে সামনে এসেছে। মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, ভুল সংবাদ ছড়িয়েছে। ইতিহাস ও জাতীয় স্মৃতিসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থার উচিত আগেভাগে তথ্য জানানো, যাতে গুজবের সুযোগ না থাকে।
সব মিলিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যে আপাতত ম্যুরাল সরানোর আশঙ্কা নাকচ হয়েছে। তবে স্বাধীনতা স্তম্ভের চূড়ান্ত নকশা ও বাস্তবায়নের সময়সূচি জানার অপেক্ষায় থাকবে সংশ্লিষ্ট মহল। সেই পরিকল্পনা কতটা স্বচ্ছভাবে জনসমক্ষে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

