বছরের পর বছর লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার ঋণের দায় এখন সরকারের কাঁধে যাচ্ছে। অগ্রণী ব্যাংকের কাছে হোটেলটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) চূড়ান্ত দেনা ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা। এই অর্থ সরকার বিএসএলের হয়ে পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে পুরো অর্থ সরাসরি সরকারের ব্যয় হিসেবে থাকছে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিএসএল পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারে করপোরেট সুকুক, বন্ড ও ইকুইটি ইস্যুর মাধ্যমে এই অর্থের একটি অংশ ফেরত দেবে।
সরকার অগ্রণী ব্যাংককে অর্থ পরিশোধের পর বিএসএল ৫০০ কোটি টাকা সুকুক বা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগ্রহ করে সরকারকে ফেরত দেবে। বাকি ৩৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিপরীতে সরকারের অনুকূলে সমমূল্যের সাধারণ শেয়ার ইস্যু করবে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা বিএসএলের সম্পদ দায়মুক্ত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে এই ঋণ পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো বাজেট থেকে অর্থ ছাড় করা হয়নি। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সংস্কারের পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি হোটেল
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপের সঙ্গে ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩০ বছর মেয়াদি পরিচালনা চুক্তির মাধ্যমে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হোটেলটির বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। এ সংস্কারের জন্য অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৫৭৪ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ঋণ নেয় বিএসএল।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সংস্কারের পর নতুনভাবে চালু হলেও হোটেলটি আর লাভের ধারায় ফিরতে পারেনি। লোকসানের কারণে ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অগ্রণী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণের অর্থ ফেরত পাচ্ছে না। এ কারণে সরকারকে এই উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।
তাদের মতে, দীর্ঘদিনের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
১০ বছর ধরে লোকসানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দেওয়া বিএসএলের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান হয়েছে ৮৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
এর আগের চার অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৭৯ কোটি, ৮৬ কোটি, ১১১ কোটি ও ১৮০ কোটি টাকা।
এর আগের বছরগুলোতেও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পরিমাণ লোকসান করেছে। দীর্ঘ সময়ের লোকসান জমতে জমতে ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসানের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
চলতি অর্থবছরেও লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে একই ধরনের বেসরকারি পাঁচতারকা হোটেল ওয়েস্টিন ও শেরাটন ঢাকার মালিক ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লাভে রয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের নিট লাভ ছিল প্রায় ১৫২ কোটি টাকা। এর আগের দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১৫১ কোটি ও ১৮৯ কোটি টাকা লাভ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন সরকারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ইন্টারকন্টিনেন্টালের মতো প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।
তার মতে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে লাভজনক করা কঠিন। সরকারের প্রতিনিধি বোর্ডে থাকতে পারেন, তবে পরিচালনার দায়িত্ব অভিজ্ঞ বেসরকারি খাতের হাতে দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ৮৮৪ কোটি টাকার মতো বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করা সরকারের জন্য কঠিন চাপ তৈরি করবে।
ঋণের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ হলো
অর্থ বিভাগের নথি অনুযায়ী, ইন্টারকন্টিনেন্টাল সংস্কারের জন্য নেওয়া ৫৭৪ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএসএল ১৯৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
অগ্রণী ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাবে বিএসএলের কাছে পাওনা ছিল ১ হাজার ৫০ কোটি ৬৭লাখ টাকা। পরে সংশোধিত হিসাবে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
তবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগের হিসাব বহাল রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক ১২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪০৯ টাকা সমন্বয় এবং ৪১ কোটি ৮১ লাখ ১৩ হাজার ৬৯২ টাকা সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর পর বিএসএলের চূড়ান্ত পরিশোধযোগ্য দেনা নির্ধারণ করা হয় ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা।
সামনে নতুন অর্থ সংগ্রহ পরিকল্পনা
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের ছয় মাসের মধ্যে বিএসএলকে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে।
এই সময়ের মধ্যে সুকুক বা বন্ড ইস্যু করা সম্ভব না হলে পরবর্তী সময় থেকে ৫০০ কোটি টাকার ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে অর্থ দিতে হবে।
পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই বন্ড বা সুকুক ইস্যু এবং সরকারের অর্থ সমন্বয়ের কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ পরিশোধ সাময়িকভাবে আর্থিক চাপ কমালেও ইন্টারকন্টিনেন্টালকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, বাজার কৌশল এবং পরিচালন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।

