শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আগামী ২২ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে ছুটি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন আসন্ন মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন নিয়ে ছুটির প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এতে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে চাকরিজীবীরা টানা পাঁচ দিন ছুটি পাবেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ছুটি সরকারি ও বেসরকারি, দুই খাতের জন্যই প্রযোজ্য হবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত হওয়ায় মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদনের আগে প্রজ্ঞাপন জারির সুযোগ নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকেই অনুমোদন মিলবে এবং এরপর প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে।
সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার নবমী উপলক্ষে নির্বাহী আদেশে ছুটি রয়েছে। পরদিন ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী উপলক্ষে সাধারণ ছুটি। এরপর ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার নতুন করে ছুটির সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন সরকারি অফিস বন্ধ থাকবে।
এই ছুটি শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য, নাকি বেসরকারি খাতও এর আওতায় পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। জবাবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেন, এটি জাতীয় ছুটি, তাই সবার জন্যই প্রযোজ্য। সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিস, সবই ছুটির সময় বন্ধ থাকবে।
তবে জরুরি সেবা এই ছুটির আওতার বাইরে থাকে। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরের কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা, টেলিফোন, ইন্টারনেট ও ডাকসেবা এবং এসব সেবায় নিয়োজিত যানবাহন ও কর্মীরা ছুটি পান না। হাসপাতাল ও জরুরি চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসক ও কর্মী, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী যানবাহন এবং জরুরি কাজের সঙ্গে যুক্ত অফিসও ছুটির বাইরে থাকে। ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আদালতের কার্যক্রম নিয়ে নির্দেশনা দেন সুপ্রিম কোর্ট। প্রজ্ঞাপনে এসব বিষয় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়।
ছুটির ধরন নিয়েও কিছু ব্যাখ্যা আছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ছুটি মূলত উদ্যাপন বা পালনের জন্য দেওয়া হয় এবং তা সর্বজনীন। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, বিজয়া দশমী, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও মে দিবস এর উদাহরণ। ২০২৬ সালের তালিকায় এমন ছুটি আছে ১৪ দিন। অন্যদিকে নির্বাহী আদেশের ছুটি সাধারণত সরকারি, আধা সরকারি, সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য। ইদানীং প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো যেসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আইনে চলে, তারা জনস্বার্থ বিবেচনা করে নিজেরাই ছুটি ঘোষণা করে। বাস্তবে সরকার যত দিন ছুটি নির্ধারণ করে, অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও তা অনুসরণ করে।
এ ছাড়া সাধারণ ও নির্বাহী ছুটির বাইরে ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থাও আছে। একজন কর্মচারী নিজ ধর্ম অনুযায়ী বছরে সর্বোচ্চ তিন দিন এই ছুটি নিতে পারেন। এ জন্য বছরের শুরুতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতে হয়। সাধারণ ছুটি, নির্বাহী আদেশের ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে যুক্ত করেও এই ছুটি ভোগ করা যায়।
এই সিদ্ধান্তের কয়েকটি দিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, ছুটির সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা। সিদ্ধান্ত নীতিগত পর্যায়ে থাকায় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের আগে কর্মীরা নিশ্চিত হতে পারছেন না। বিশেষ করে যাঁরা দূরের জেলায় বাড়ি যাবেন বা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি জরুরি। টিকিট কেনা ও যাতায়াতের প্রস্তুতির জন্য সময় লাগে।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের বাস্তবতা। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলছেন, ছুটি সবার জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু নির্বাহী আদেশের ছুটি আইনগতভাবে মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য। ফলে প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ থাকা দরকার। তাহলে বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে না।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রভাব। টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে উৎপাদন, রপ্তানি ও ব্যবসায়িক লেনদেনে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে পর্যটন, পরিবহন ও বাজার খাতে বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়। ফ্যাক্টরি ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগে উৎপাদন ও চালান পরিকল্পনা সাজিয়ে নিতে হবে।
চতুর্থত, জরুরি সেবার ধারাবাহিকতা। ছুটির সময় বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, ব্যাংকিং ও পরিবহনের মতো সেবা যেন স্বাভাবিক থাকে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। পূজার সময় মণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের বাড়তি দায়িত্ব।
পঞ্চমত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। বৃহত্তম হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে বাড়তি ছুটি সম্প্রদায়ের মানুষকে পূজা উদ্যাপন ও পারিবারিক মিলনের সুযোগ দেয়। এটি ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তাও বহন করে।
সব মিলিয়ে ছুটির সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে দ্রুত মন্ত্রিসভার অনুমোদন, স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন এবং জরুরি সেবার জন্য আগাম নির্দেশনা নিশ্চিত হলেই সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে ছুটি উপভোগ করতে পারবেন।

