দীর্ঘ ১১ বছর পর আবারও সরকারি ঋণ সহায়তা পাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রতিষ্ঠানটিকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে না পারায় বিপিসির আর্থিক চাপ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির অর্থ সংকট মোকাবিলায় অর্থ বিভাগ থেকে এ ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটের পরিচালন ঋণ খাত থেকে এই অর্থ দেওয়া হবে।
শর্ত অনুযায়ী, বিপিসিকে পাঁচ বছরের মধ্যে ছয় মাস পরপর কিস্তিতে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ঋণ ব্যবহারের জন্য অর্থ বিভাগ ও বিপিসির মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে।
এই অর্থ শুধু অনুমোদিত জ্বালানি-সংক্রান্ত ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।
বিপিসি এর আগে জানিয়েছিল, নতুন অর্থায়ন না পেলে অক্টোবর থেকেই জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগকে দেওয়া এক চিঠিতে বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে তার পুরোপুরি সমন্বয় না হওয়ার কারণে হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী দেশে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার পর থেকে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি।
ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে সরকার কিছুটা মূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তবে এর ফলে বিপিসির লোকসান বেড়েছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ায়। এরপরও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশের জ্বালানি দামে ব্যবধান রয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছিলেন, স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হলে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার প্রায় ২০৫ টাকা হতে পারত। বর্তমানে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা লিটারে।তার মতে, প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা চাপ এখনো সরকার বহন করছে।
একসময় সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল বিপিসির আর্থিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার পর।
২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত অধিকাংশ সময় বিপিসি বছরে ৫ হাজার কোটি থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লাভ করেছে।
তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বিপিসির ১ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা লোকসান হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর আবারও বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে ডিসেম্বরের মধ্যে বিপিসির আরও ৬৯০ কোটি টাকা প্রয়োজন।আন্তর্জাতিক ইসলামী বাণিজ্য অর্থায়ন সংস্থার ঋণ পরিশোধের দায়ও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ওপর।
বিপিসিকে দেওয়া ঋণ এমন সময়ে আসছে, যখন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার পরিমাণ বাড়ছে।২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নগদ ঋণ হিসেবে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
এর আগে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব অর্থ কাগজে ঋণ হিসেবে দেওয়া হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান নানা কারণে তা ফেরত দিতে পারে না। ফলে পরবর্তী সময়ে তা সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়ায়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিপিসির লোকসান দেখাচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা দিয়ে এই চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সরবরাহে কোনো বিঘ্ন এড়াতে এই অর্থ দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। তবে ঋণ হিসেবে দেওয়া হলেও তা সরকারের তাৎক্ষণিক নগদ প্রবাহের ওপর চাপ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে। বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে নাকি উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে তা সামাল দেওয়া হবে, সেটিই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

