রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভের (পিওআরভি/পিওএসভি) ১৬ এমপিএ উচ্চচাপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে শেষ হওয়া এই পরীক্ষাকে ইউনিটটির কমিশনিং প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে জানিয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)।
পরবর্তী ধাপে প্রায় ১৮ এমপিএ চাপে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চালুর পথে এটি একটি স্পষ্ট অগ্রগতি, তবে চূড়ান্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৌঁছাতে এখনো একাধিক ধাপ বাকি।
এনপিসিবিএল জানায়, পরীক্ষাটি শুরু হয় ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে। এটি পরিচালিত হয় মেইন কন্ট্রোল রুম (এমসিআর) ও ইমার্জেন্সি কন্ট্রোল রুম (ইসিআর), এই দুই স্থান থেকেই। দুই কন্ট্রোল রুম থেকে পরীক্ষা চালানো প্রমাণ করে, জরুরি পরিস্থিতিতেও যেন ভালভ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়, সেই সক্ষমতা যাচাইয়ের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষার সময় প্রকৌশলীরা প্রথমে কন্ট্রোল ভালভগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করেন। সেগুলো সন্তোষজনকভাবে কাজ করার পর সংশ্লিষ্ট মেইন সেফটি ভালভগুলোর (এমএসভি) কার্যকারিতা ও প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়। এ সময় ভালভের প্রতিক্রিয়া, খোলা ও বন্ধ হওয়ার ক্ষমতা, অ্যালার্ম এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার বিভিন্ন প্যারামিটার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ পরীক্ষাটি ধাপে ধাপে, আগে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, এই ক্রমে পরিচালিত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা কমিশনিংয়ের মতো স্পর্শকাতর কাজে যুক্তিসংগত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদিত পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা শর্ত মেনেই পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগে এবং চলাকালে যোগাযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও বিকিরণ সুরক্ষার ব্যবস্থাও যাচাই করা হয়। পারমাণবিক স্থাপনায় কোনো একক পরীক্ষাও শুধু যন্ত্রের কার্যকারিতার বিষয় নয়, সঙ্গে সহায়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই দিক থেকে এসব যাচাই পরীক্ষার পরিধিকে বিস্তৃত করেছে।
এনপিসিবিএলের কর্মকর্তাদের মতে, পিওআরভি পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়া কমিশনিং প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ চুল্লির প্রাইমারি সার্কিটে নিরাপদ চাপ বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চাপ নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে রিলিফ ভালভ খুলে অতিরিক্ত চাপ কমায়, ফলে এর নির্ভরযোগ্যতা সরাসরি চুল্লির নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তাই এই ভালভের ধারাবাহিক ও ধাপে ধাপে পরীক্ষা কমিশনিংয়ের অপরিহার্য অংশ।
তারা আরও জানান, কমিশনিংয়ের পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, অনুমোদন, ব্রিফিং ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই প্রতিটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এনপিসিবিএলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সময়সূচি ঠিক রাখার জন্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। প্রকল্পটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সময়সূচি ও অগ্রগতির আলোচনা রয়েছে, ফলে এমন অবস্থান জনমনে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টির কার্যকর মূল্যায়ন হবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর ফলাফল ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
পরবর্তী ধাপে প্রায় ১৮ এমপিএ চাপে পরীক্ষা চালানোর কথা রয়েছে। কমিশনিং দল ধাপে ধাপে প্রতিটি পর্যায় যাচাই করে পরবর্তী কার্যক্রমে এগোবে। অর্থাৎ ১৬ এমপিএর সফল পরীক্ষা পরবর্তী উচ্চতর চাপের পরীক্ষার ভিত্তি তৈরি করেছে, তবে চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার ঝুঁকি ও যাচাইয়ের গুরুত্বও বাড়বে।
সব মিলিয়ে এই পরীক্ষার সাফল্য রূপপুর প্রকল্পের জন্য ইতিবাচক সংকেত। তবে এনপিসিবিএল পরবর্তী পরীক্ষার নির্দিষ্ট তারিখ বা কমিশনিং সম্পূর্ণ হওয়ার সময়সীমা জানায়নি। কমিশনিংয়ের প্রতিটি ধাপ নিরাপত্তা যাচাইয়ের একেকটি পরীক্ষা, আর শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এসব ধাপের সবগুলোতে সন্তোষজনক ফল পাওয়াই মূল শর্ত। তাই ১৮ এমপিএ চাপের পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফলের দিকে নজর থাকবে।

