যশোরের জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ২৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার সাতজনের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়নি পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের অব্যাহতি চেয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের এই ঘটনায় দুই বছরের বেশি সময় পরও কেউ বিচারের মুখোমুখি হননি, ফলে নিহতদের স্বজনদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন সম্প্রতি আদালতে প্রতিবেদনটি জমা দেন। বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিভিন্ন সময়ে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো সাত আসামির বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। তাই তাঁদের অব্যাহতির আবেদন করা হয়েছে। প্রতিবেদনের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন আদালত। অর্থাৎ অব্যাহতি এখনো চূড়ান্ত নয়; আদালত প্রতিবেদন গ্রহণ করতেও পারেন, আবার আরও তদন্তের নির্দেশও দিতে পারেন।
অব্যাহতি চাওয়া সাতজন হলেন মো. আব্দুল খালেক (৬৫), মো. এনামুল হক (৫৯), আব্দুর রহমান শাওন (৩৬), অ্যাডভোকেট সৈয়দ কবির হোসেন জনি (৪১), এস এম আজহার হোসেন স্বপন (৫২), কাজী রবিউল হোসেন ওরফে ভাইপো রবিউল (৩১) ও মো. ইমন কাজী (২৬)। তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এখানে লক্ষ করার বিষয়, প্রতিবেদনে ব্যবহৃত শব্দবন্ধ ‘সরাসরি সম্পৃক্ততা’। এর অর্থ এই নয় যে ঘটনার সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্কই ছিল না, বরং পুলিশ আইনি মানদণ্ডে তাঁদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ দাঁড় করাতে পারেনি। আবার একইভাবে, অব্যাহতির আবেদন মানেই তাঁদের নির্দোষ সাব্যস্ত হওয়া নয়, কারণ সেই সিদ্ধান্ত আদালতের।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, যশোর শহরের চিত্রা মোড়ের এমএম আলী রোডে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন পাঁচ তারকা মানের আবাসিক হোটেল ‘জাবির ইন্টারন্যাশনাল’ অবস্থিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা তিনটার দিকে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা গানপাউডার ও পেট্রল নিয়ে হোটেলে ঢোকে। অভিযোগে বলা হয়, তারা প্রথমে ক্যাশ ভল্ট ভেঙে ৯০ লাখ টাকা লুট করে। এরপর ১০০টি ফ্রিজ, ১০০টি স্মার্ট টিভি, ৪৫০ কিলোভোল্টের দুটি জেনারেটর, স্টোরের মালামাল ও আসবাব, এক হাজার কিলোভোল্টের ট্রান্সফরমারসহ সাবস্টেশন, প্রেসার পাম্প, সাইবার স্টেশন ও ফায়ার ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। লুটের পর গানপাউডার ও পেট্রল ব্যবহার করে প্রথম তলা থেকে ১৬ তলা পর্যন্ত আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এই আগুনে একজন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকসহ ২৪ জন দগ্ধ হয়ে মারা যান। নিহতদের মধ্যে হোটেলের কর্মচারী ও অতিথিরাও ছিলেন। লুটের তালিকার পরিধি, বিপুল পরিমাণ ভারী সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া এবং ১৬ তলা পর্যন্ত আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার বিবরণ থেকে ঘটনাটি যে পরিকল্পিত ও বড় পরিসরের ছিল, তা অনুমান করা যায়। তবে এই অনুমান আদালতে প্রমাণের বিষয়, আর এখন পর্যন্ত সেই প্রমাণ কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারেনি।
ঘটনার পর ১৮ আগস্ট শাহীন চাকলাদারের চাচাতো ভাই ও সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামা ২০০ জনকে। এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, হোটেলের আলমারিতে রাখা শাহীন চাকলাদারের বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যবান কাগজপত্র, আসবাব, স্টোরের মালামাল, সব বৈদ্যুতিক সামগ্রী, তিনটি লিফট, জানালার গ্রিল ও কাচের দরজার সজ্জা পুড়ে গেছে। মূল ভবনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা যায়নি। মামলাটি অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হওয়ায় তদন্তকারীদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা। সন্দেহভাজন হিসেবে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও দীর্ঘ তদন্তে সেই সন্দেহ প্রমাণে রূপ নেয়নি।
এই পরিস্থিতি থেকে কয়েকটি প্রশ্ন উঠে আসে। প্রথমত, গ্রেপ্তারের সময় কোন তথ্যের ভিত্তিতে এই সাতজনকে সন্দেহভাজন ধরা হয়েছিল এবং পরে কেন সেই ভিত্তি টেকেনি, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, সাতজন অব্যাহতি পেলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তের দায়িত্ব কার ওপর বর্তাবে এবং তদন্ত আর কতদূর এগোবে, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। তৃতীয়ত, ২৪ জন নিহতের এই ঘটনায় যদি কাউকেই দায়ী করা না যায়, তবে নিহতদের পরিবারের কাছে বিচারপ্রাপ্তির আশ্বাস কীভাবে পৌঁছাবে, সেটি আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। চতুর্থত, রাজনৈতিক পরিচয় ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্তের মান নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, এই মামলাটি সেই আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। তবে প্রতিবেদনে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি, তাই এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এখন নজর আদালতের দিকে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে সাতজনকে অব্যাহতি দেওয়া হবে, নাকি বাদীপক্ষের আপত্তির মুখে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ আসবে, তা নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। বাদীপক্ষের অবস্থান এখনো জানা যায়নি। সব মিলিয়ে ২৪ জনের প্রাণহানির এই ঘটনায় তদন্ত শেষ হলেও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও বিচারের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।

