আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে দেওয়া বাণীতে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থা নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গড় আয়ু বাড়ার যুগে প্রত্যেক মানুষের বার্ধক্য যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, সেটিই তাঁর বার্তার কেন্দ্রে। আজ ১ অক্টোবর ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’, যার ইংরেজি রূপের বাংলা উচ্চারণ ‘দ্য এইজ অব লংজিবিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতি ও জীবনমানের উন্নয়নে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, ফলে সব দেশেই প্রবীণের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁর ভাষ্যে, দীর্ঘায়ুর এই যুগ প্রবীণ নাগরিকদের সেবা ও সুযোগের কাঠামো ঢেলে সাজানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি প্রতিপাদ্যকে সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ বলেছেন। বাণীর সুর লক্ষ করার মতো, কারণ এখানে জনসংখ্যার বার্ধক্যকে বোঝা নয়, নীতি পুনর্বিন্যাসের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হলেও তা বাস্তব নীতিতে কতটা প্রতিফলিত হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন।

বার্ধক্যকে মানুষের স্বাভাবিক জীবনচক্রের অংশ ও অনিবার্য উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাই প্রত্যেকের বার্ধক্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তিনি মনে করিয়ে দেন, সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলা হয়েছে। এর অর্থ, প্রবীণদের কল্যাণ কেবল করুণা বা সদিচ্ছার বিষয় নয়, এটি সাংবিধানিক অঙ্গীকারও। ফলে এ ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে তা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্নই তোলে।
সেই দায়িত্বের ধারাবাহিকতায় সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা খাতে ৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রবীণদের কল্যাণে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে, যা মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে বাণীতে ভাতা কতটা বেড়েছে, কতজন নতুন সুবিধাভোগী যুক্ত হয়েছেন কিংবা অন্য পদক্ষেপগুলো কী, তার কোনো বিস্তারিত নেই। বরাদ্দ বাড়া একটি দিক, কিন্তু সেই অর্থ প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা যাচাই করতে আলাদা তথ্য দরকার। আবার ভাতা আর্থিক সহায়তা দিলেও আবাসন, পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা এতে মেটে না। প্রতিপাদ্যের ‘নতুন ভাবনা’ আসলে এই সমন্বিত কাঠামোর দিকেই ইঙ্গিত করে।
প্রবীণদের অবদানের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁরা শুধু অতীতের গল্প নন, তাঁরা বর্তমানের শিকড় এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। তাঁদের শ্রম, ঘাম, মেধা, ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই আজকের বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, প্রবীণদের একটি বড় অংশ অবনতিশীল স্বাস্থ্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই বাস্তবতার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমস্যা চিহ্নিত করাই নীতি প্রণয়নের প্রথম ধাপ। তাঁর মতে, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে প্রবীণদের প্রতি যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।
রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও জনহিতৈষী সংগঠন, বিত্তবান ব্যক্তি এবং প্রতিটি পরিবার প্রবীণদের কল্যাণে আরও সক্রিয় হবে। তাঁর মতে, প্রবীণদের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁদের হাসিমুখ ও নিরাপদ বার্ধক্য নিশ্চিত করা সবার অঙ্গীকার হওয়া উচিত। এই আহ্বানে পরিবারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিঃসঙ্গতা ও মানসিক একাকিত্বের মতো সমস্যায় রাষ্ট্রীয় সেবার চেয়ে পরিবারের সান্নিধ্যই বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক পরিবারের পক্ষেই প্রবীণের দায়িত্ব নেওয়া কঠিন, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের সহায়ক ভূমিকা অপরিহার্য।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ঠিক এক বছর পর, ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবার দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রবীণ নাগরিকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর র্যালি, আলোচনা সভা, জাতীয় পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ, মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমে প্রবীণদের মর্যাদা বিষয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচারসহ নানা কর্মসূচি নিয়েছে। এসব আয়োজন সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হলেও দিবসের বার্তার প্রকৃত পরীক্ষা হবে স্বাস্থ্য, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতিতে। রাষ্ট্রপতির আহ্বান তাই শুধু শুভেচ্ছার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে।

