বাংলাদেশের শহরগুলোতে, বিশেষ করে রাজধানীতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেটের তীব্র অভাব এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটের জন্ম দিয়েছে।
শৌচাগারের অভাবে বাইরে বের হলে নারীরা বাধ্য হয়ে পানি পান করা কমিয়ে দিচ্ছেন, যার ফলে তারা মূত্রনালির সংক্রমণসহ (ইউটিআই) নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগের কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে উৎকট দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিং, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ডেবরা এফ্রয়মসন তার এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে এই সংকটের গভীরতা এবং তা সমাধানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের পাশাপাশি বেশ কিছু অভিনব প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার মতো বিশাল মেগাসিটিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি গণশৌচাগারের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে স্থায়ী শৌচাগার রয়েছে মাত্র ১৩১টি এবং ভ্রাম্যমাণ বা মোবাইল টয়লেট আছে ১৭টি।
বিশাল এই ঘাটতি কেবল সরকারি উদ্যোগে বা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে রাতারাতি দূর করা প্রায় অসম্ভব। ডেবরা এফ্রয়মসনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের শৌচাগার সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা বা উৎসাহিত করা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট ফি-এর বিনিময়ে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ব্যবহারের যে চল রয়েছে, তা বাংলাদেশেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে ওই নিবন্ধে মেক্সিকো সিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে কিছু দোকান মাত্র ২৫ সেন্ট (প্রায় ৩১ টাকা) ফি-এর বিনিময়ে তাদের শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
ইস্তাম্বুল, ভিয়েতনাম বা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন শহরেও সামান্য অর্থের বিনিময়ে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ শৌচাগার ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যের শৌচাগারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ে।
তাই সামান্য ফি নির্ধারণ করে সেখানে সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখা হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী হবে। তবে এই ফি এমন হতে হবে যেন তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায় এবং নিতান্তই যাদের সামর্থ্য নেই তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও থাকতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শৌচাগারগুলো যেন ব্যবহার-উপযোগী হয়, সেদিকেও জোর দেওয়া হয়েছে।
শহরের শপিংমল ও মার্কেটগুলোতে পর্যাপ্ত শৌচাগার থাকা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নজরদারির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই বিশ্লেষণে।
শৌচাগার পরিষ্কার বা ব্যবহার উপযোগী না থাকলে সাধারণ মানুষ যেন সহজেই অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য একটি নির্দিষ্ট হটলাইন নম্বর চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মার্কেট কর্তৃপক্ষকে জরিমানার আওতায় আনা গেলে শৌচাগারের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
এছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে শৌচাগার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা যেতে পারে।
শৌচাগার ব্যবস্থাপনায় মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকটির ওপরও আলোকপাত করেছেন ডেবরা এফ্রয়মসন। কলম্বিয়ার বোগোটা শহরের সাবেক পার্কিং ও বিনোদন প্রধান গিল পেনালোসার একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, একটি পাবলিক টয়লেটে তাজা ফুল রাখার কারণে ব্যবহারকারীরা ওই স্থানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছিলেন এবং সেটি অনেক বেশি পরিষ্কার রাখতেন।
অর্থাৎ পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকলে মানুষ স্বভাবতই সেখানে শিষ্টাচার মেনে চলে। অন্যদিকে একটি দুর্গন্ধযুক্ত ও জরাজীর্ণ শৌচাগার মানুষকে অপরিচ্ছন্নতায় উৎসাহিত করে।
পরিশেষে, গণশৌচাগারকে কেবল একটি শহরের সাধারণ সম্পদ হিসেবে না দেখে একে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে ওই বিশ্লেষণে। ইচ্ছাশক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলেই এই সংকট মেটানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

