বায়ুদূষণের কারণে আবারও আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আজ ৩ অক্টোবর সকাল ৯টা ১৪ মিনিটে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। এ সময় রাজধানীর বায়ুমান সূচক ১৭০-এ পৌঁছায়, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের বায়ুর নির্দেশ করে।
অর্থাৎ, এদিন সকালে ঢাকার বাতাস শুধু সংবেদনশীল মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না; সাধারণ মানুষের জন্যও এই বায়ুর মান স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বাইরে অবস্থান করা বা শারীরিক পরিশ্রমের মতো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে দূষিত বাতাসের প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।
বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার ওপরে ছিল পাকিস্তানের লাহোর এবং ভারতের কলকাতা। লাহোরের বায়ুমান সূচক ছিল ২১৪, আর কলকাতার ছিল ১৯০। অন্যদিকে ঢাকার পর চতুর্থ অবস্থানে ছিল ভারতের দিল্লি, যেখানে বায়ুমান সূচক রেকর্ড করা হয় ১৬৮। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক বড় শহরই একই সময়ে তীব্র বায়ুদূষণের মধ্যে ছিল।
ঢাকার ১৭০ সূচককে ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে ধরা হয়। বায়ুমান সূচকের হিসাবে ৫০ থেকে ১০০ পর্যন্ত মাত্রাকে সাধারণভাবে মাঝারি মানের হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ পর্যায়ে অধিকাংশ মানুষের জন্য বাতাস মোটামুটি গ্রহণযোগ্য থাকলেও সংবেদনশীল ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে।
সূচক ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত মাত্রা সরাসরি অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। এরপর ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত বায়ুমান সূচককে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-এর বেশি হলে বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়। ফলে ঢাকার ১৭০ সূচক এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বায়ুদূষণকে দৈনন্দিন স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বায়ুমান সূচক মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাতাসের দূষণের মাত্রা এবং এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ধারণা দেওয়ার একটি ব্যবস্থা। সূচকের মান যত বাড়ে, বাতাসে দূষণের মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে। ফলে শহরের বায়ুমান সূচক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা নগরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে এই বায়ুমান সূচক নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দূষণকারী উপাদান বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম কণাদূষণ, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং ওজোন। এসব উপাদানের ঘনত্ব বাতাসের সামগ্রিক মানকে প্রভাবিত করে এবং নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি হলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকার বায়ুদূষণের সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীর বায়ু দূষণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে পরিস্থিতি সাধারণত আরও খারাপ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে বাতাসের বিভিন্ন দূষণকারী কণা নিচে নেমে আসায় বায়ুর মান তুলনামূলকভাবে উন্নত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
শীতকালে ঢাকার বায়ুর মান কেন দ্রুত অবনতি ঘটে, তার পেছনে আবহাওয়াগত কারণও রয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল সীমিত হলে বিভিন্ন উৎস থেকে নির্গত দূষণকারী কণা সহজে ছড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে শহরের বাতাসে দূষণের ঘনত্ব বাড়তে থাকে। একই সময়ে নগরজীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে তৈরি ধুলা ও ধোঁয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে বায়ুদূষণের প্রভাবও তুলনামূলকভাবে ব্যাপক। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় বাইরে চলাচল করেন। ফলে বাতাসের মান খারাপ হলে তার প্রভাব শুধু একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; নগরের বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য দূষিত বাতাসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। তবে বায়ুমান সূচক যখন অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন শুধু সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী নয়, সাধারণ মানুষেরও দীর্ঘ সময় দূষিত বাতাসে অবস্থান নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বায়ুদূষণের বিষয়টি শুধু ঢাকার সমস্যা নয়; এটি বিশ্বব্যাপী একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, বায়ুদূষণকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়। একটি শহরের বাতাস নিয়মিত অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর পড়তে পারে।
ঢাকার ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কারণ হলো, শহরটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রতিদিন এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস ও চলাচল করেন। ফলে বায়ুদূষণের মাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেলেও এর প্রভাব পড়তে পারে বড় একটি জনগোষ্ঠীর ওপর।
আজকের ১৭০ সূচক তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি রাজধানীর বর্তমান বায়ু পরিস্থিতির একটি তাৎক্ষণিক চিত্র। আবার একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বায়ুমান সূচক একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে। দিনের বিভিন্ন সময়ে আবহাওয়া, বাতাসের গতি, দূষণের উৎস এবং অন্যান্য পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এই সূচকের মানও পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে ঢাকার ক্ষেত্রে উদ্বেগের জায়গাটি হলো, বায়ুদূষণ প্রায়ই সাময়িক কোনো ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। বছরের বিভিন্ন সময়ে এর মাত্রা ওঠানামা করলেও দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীকে বায়ুদূষণের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুম সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আজকের তালিকায় ঢাকার তৃতীয় অবস্থান সেই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একই সময়ে লাহোর, কলকাতা ও দিল্লির মতো দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোরও দূষণের উচ্চ মাত্রায় অবস্থান করা দেখাচ্ছে যে অঞ্চলটির দ্রুত নগরায়ণ ও পরিবেশগত চাপের সঙ্গে বায়ুদূষণের একটি বড় সম্পর্ক রয়েছে।
ঢাকার বাতাসের মান উন্নত করতে হলে তাই শুধু দূষণের মাত্রা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও বায়ুমান সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
আজ ৩ অক্টোবর সকাল ৯টা ১৪ মিনিটে ১৭০ সূচক নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার তৃতীয় অবস্থান রাজধানীর বায়ু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। এটি এক দিনের একটি পরিসংখ্যান হলেও ঢাকার দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ সমস্যার বৃহত্তর চিত্রের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে। শীত মৌসুম সামনে থাকায় আগামী দিনগুলোতে রাজধানীর বায়ুর মান কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিও এখন বিশেষভাবে নজরে রাখার বিষয়।

