এক মাসের ব্যবধানে মা-বাবাকে হারানো পাঁচ কন্যার পরিবারে সহায়তা পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত শুক্রবার ঢাকার দোহার উপজেলার রাধানগর গ্রামে গিয়ে পরিবারটির হাতে আর্থিক সহায়তা ও উপহারসামগ্রী তুলে দিয়েছে একটি প্রতিনিধিদল। সংবাদমাধ্যমে মেয়েদের অসহায়ত্বের খবর প্রকাশের পরই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এই তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ঘটনাটি দোহারের বিলাশপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের। এখানকার কৃষক আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর স্ত্রী ফরিদা বেগম মাত্র ৩১ দিনের ব্যবধানে মারা যান। প্রথমে মৃত্যু হয় ফরিদা বেগমের। এর এক মাসের মধ্যে মারা যান আবুল কালাম আজাদ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিনের অভাব-অনটন ও ঋণের চাপে পরিবারটি ভীষণ সংকটে ছিল। বাবা-মাকে হারিয়ে পাঁচ মেয়ে এখন সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। গণমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে, অভাবের সংসারে এই পাঁচ মেয়ের কী হবে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে বলে জানানো হয়েছে। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ নামের সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদন দেখে তিনি তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে নির্দেশ দেন, যেন পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়।
নির্দেশ অনুযায়ী শুক্রবার সংগঠনের সদস্য সচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুনের নেতৃত্বে একটি দল রাধানগরে যায়। তাঁরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে খোঁজখবর নেন এবং এতিম পাঁচ কন্যার সঙ্গে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পরিবারটির জন্য আর্থিক সহায়তা ও উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। তবে সহায়তার অঙ্ক সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মোকছেদুল মোমিন মিথুন বলেন, দল-মত নির্বিশেষে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী এই সংগঠন গড়েছেন। এই পরিবারের দুর্দশার খবর প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তার নির্দেশ দেন বলে তিনি জানান। সহমর্মিতা ও সহযোগিতার বার্তা নিয়েই তাঁরা এসেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভবিষ্যতেও এমন বিপদগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ চলবে।
প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সদস্য মাসুদ রানা লিটন ও মুস্তাকিম বিল্লাহ, দোহার উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ এবং ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসনাইন নাহিয়ান সজীব। ছিলেন বুয়েট ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবু হানিফ, ছাত্রদল নেতা মশিউর রহমান মহান ও আব্দুল্লাহ আল মিসবাহসহ স্থানীয় নেতারা।
এ ঘটনার একটি মানবিক দিক রয়েছে, যা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। সংবাদমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে দ্রুত সাড়া মেলা ইতিবাচক। সংকটে থাকা একটি পরিবারের কাছে এমন সহায়তা তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়। একই সঙ্গে এটি গণমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতার ভূমিকাও সামনে আনে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সহায়তা ভালো শুরু হলেও যথেষ্ট নয়। একবারের আর্থিক অনুদান ও উপহার সাময়িক চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু পাঁচটি শিশুর পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া, নিরাপদ অভিভাবকত্ব ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। কারা মেয়েদের দেখভাল করবেন, তাদের শিক্ষাজীবন কীভাবে চলবে এবং পরিবারের ঋণের দায় কী হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতির কথা জানানো হয়নি।
ঘটনাটি গ্রামীণ দারিদ্র্যের একটি বড় চিত্রও তুলে ধরে। ঋণের চাপ ও টানা অভাব অনেক কৃষক পরিবারকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এমন পরিবারগুলো প্রায়ই সংকটের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আলোচনায় আসে। অথচ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ক্ষুদ্রঋণের সহনীয় শর্ত এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত খোঁজখবর থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সংকট আগেই সামাল দেওয়া সম্ভব। মানসিক চাপে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য গ্রামপর্যায়ে কাউন্সেলিং ও সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। কেউ গভীর মানসিক কষ্টে থাকলে পরিবার, প্রতিবেশী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলা এবং সহায়তা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। ব্যক্তি বা সংগঠনের উদ্যোগে সহায়তা পাওয়া একটি পরিবারের জন্য সৌভাগ্যের হলেও দেশের সব অসহায় পরিবার সমান মনোযোগ পায় না। তাই খবর প্রকাশ হলে তবেই সহায়তা মিলবে, এমন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে একটি নিয়মিত ও সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে এতিম ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষার আওতায় আসবে।
এখন নজর থাকবে এই সহায়তা কতটা ধারাবাহিক হয়, সেদিকে। মেয়েদের শিক্ষা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব কারা কীভাবে নেন এবং স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর এতে কী ভূমিকা রাখে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনের নেতারা ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ পেলে রাধানগরের এই পাঁচ কন্যা সংকট কাটিয়ে নতুন করে জীবন শুরুর সুযোগ পেতে পারে।

