বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বড় ধরনের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করতে সৌরশক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে আগামী দিনের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নীতিভিত্তিক ঋণের মাধ্যমে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন দ্রুততর করা, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং দেশের জ্বালানি কাঠামোকে আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও অন্যান্য প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং সরবরাহ সংকটের কারণে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগের বাধা দূর করা এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ঋণের আওতায় কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক মূলত আর্থিক স্থায়িত্ব, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন এবং জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য শক্তির কার্যকর সংযুক্তির জন্য কিছু সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক তাদের বিদ্যমান অর্থায়ন পাইপলাইন থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এর সঙ্গে আরও অর্থ যোগ করে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের একটি বড় সহায়তা প্যাকেজ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত ঋণের পরিমাণ এবং সময়সূচি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নীতিগত সহায়তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে।
সরকারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো আগামী গ্রীষ্মের আগেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে অতিরিক্ত ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। সম্ভাব্য বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর জন্য এই পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বেসরকারি খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদকদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৫ বিলিয়ন টাকা বা ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ বিলিয়ন টাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের বাজেট বরাদ্দ থেকে এবং ৫ বিলিয়ন টাকা পরিচালন ঋণ থেকে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ মনে করেন, সরকারের নির্ধারিত ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বড় অঙ্কের অর্থায়ন প্রয়োজন। তার মতে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কম খরচের অর্থায়ন পাওয়া গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের একটি উপায় নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। দেশের বিপুল পরিমাণ ছাদ, শিল্পাঞ্চল এবং খালি জায়গা ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ কমবে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কমানো যাবে।
তবে এই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ নীতি, বিদ্যুৎ গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের কার্যকর সংযোগ, প্রকল্প অনুমোদনের গতি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বিকল্প শক্তির উৎস নয়, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সম্ভাব্য সহায়তা এবং সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

