মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহ সমাহিত, সৎকার ও পরিবহনের তাৎক্ষণিক ব্যয় মেটাতে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ টাকা ছাড় করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। সারা দেশের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তা খরচ করা হবে। আদেশে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে একাধিক কঠোর শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বাজেট অধিশাখা গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করে। বরাদ্দের অর্থ দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুকূলে ছাড় করা হবে।
আদেশ অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের পরিচালন বাজেটের বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় যুদ্ধাহত ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা খাতে দাফন বাবদ অনুদান হিসেবে ১৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এই ১৮ কোটি টাকার মধ্য থেকেই ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ টাকা এখন ছাড় করা হলো। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও কিছু বেশি এই ধাপে দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ছাড় হতে পারে।
অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়াও আদেশে বলে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিজ নিজ এলাকার হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে টাকা তুলবে। এ জন্য সারণি অনুযায়ী মোট বরাদ্দের অথরিটি সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠাতে চীফ একাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারকে অনুরোধ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা যথাযথ বিলের মাধ্যমে জেলা বা উপজেলা ট্রেজারি থেকে অর্থ তুলবেন। ছাড় করা অর্থ চলতি অর্থবছরের বাজেটের নির্ধারিত দাফন বাবদ অনুদান খাতে সমন্বয় করা হবে।
ব্যয়ের ক্ষেত্রে আদেশে কয়েকটি শর্ত দেওয়া হয়েছে: মুক্তিযোদ্ধার মৃতদেহ সৎকার, সমাহিত ও পরিবহন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই অর্থ খরচ করা যাবে না। ব্যয়ের সময় সরকারি আর্থিক বিধি-বিধান ও নিয়মাচার যথাযথভাবে মানতে হবে। কোনো অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট বিতরণকারী কর্তৃপক্ষকে দায়ী থাকতে হবে। আগামী ৩০ জুন ২০২৭ তারিখের পর কোনো অর্থ অব্যয়িত থাকলে তা সরকারি কোষাগারের নির্ধারিত খাতে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে।
আদেশে দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্য সিস্টেম এনালিস্টকেও অনুরোধ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বাজেট) ডা. মু. আসাদুজ্জামান আদেশে স্বাক্ষর করেন।
এই বরাদ্দের পেছনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার একটি বড় দিক আছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর পরিবারকে যেন দাফন বা সৎকারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে না হয়, সেই লক্ষ্যেই এই অনুদান। বয়সের কারণে প্রতিবছরই অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত হচ্ছেন। ফলে এ ধরনের তহবিল আগেভাগে ছাড় করে রাখা একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা।
তাৎক্ষণিক ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ স্থানীয় প্রশাসনের হাতে দেওয়া হয়েছে, যা প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত করার কথা। মৃত্যুর পর পরিবারকে সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হয়। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অর্থ মজুত থাকলে সহায়তা পেতে দেরি কম হওয়ার কথা।
তবে বাস্তবায়নে কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মাঠপর্যায়ে সহায়তা পেতে পরিবারকে যেন অকারণ কাগজপত্র ও দৌড়ঝাঁপের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। দ্বিতীয়ত, বরাদ্দ কত টাকা কোন জেলা বা উপজেলা পাচ্ছে এবং প্রতিটি পরিবার কত টাকা পাচ্ছে, সেই তথ্য প্রকাশ্য থাকলে স্বচ্ছতা বাড়ে। আদেশে জেলাভিত্তিক অঙ্ক সারণিতে থাকলেও প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত নেই।
অনিয়মের দায় বিতরণকারী কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তানো এবং অব্যয়িত অর্থ ফেরতের শর্ত আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষার দিক থেকে ইতিবাচক। তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে তদারকি হয়, তার ওপরই অর্থের সঠিক ব্যবহার নির্ভর করবে।
এখন নজর থাকবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অর্থ কত দ্রুত পৌঁছায় এবং প্রকৃত পরিবারগুলো কতটা সহজে সহায়তা পায়। বাকি বরাদ্দ কখন ছাড় হয়, সেটিও দেখার বিষয়। দাফন ও সৎকারে এই সহায়তা যথাযথভাবে পৌঁছালেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান বাস্তব রূপ পাবে।

