বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যুক্ত হয়েছে। রাশিয়া থেকে আনা পারমাণবিক জ্বালানির দ্বিতীয় চালান বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইউরেনিয়াম বহনকারী লরিগুলো রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায় বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের সাইট অফিসের ইনচার্জ মো. রুহুল কুদ্দুস। এর আগে শুক্রবার রাতে রাশিয়া থেকে আসা বিশেষ কার্গো বিমানে করে পারমাণবিক জ্বালানি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
বাংলাদেশে এটি ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য জ্বালানি পরিবহনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। সেই অনুযায়ী বিমানবন্দর থেকে রূপপুর পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথে নেওয়া হয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
রূপপুর প্রকল্পের সাইট অফিসের ইনচার্জ জানান, শনিবার সকাল ৭টার দিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় বিমানবন্দর থেকে পরমাণু জ্বালানিবাহী লরিগুলো রওনা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বহরটি নিরাপদে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে যায়।
রাশিয়া থেকে আসা বিশেষ চার্টার্ড কার্গো বিমানটি শুক্রবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকায় অবতরণ করে। এরপর প্রয়োজনীয় খালাস কার্যক্রম, নিরাপত্তা যাচাই এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে জ্বালানিবাহী গাড়িগুলো রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
পরমাণু জ্বালানি পরিবহনের সময় ঢাকা-পাবনা মহাসড়কেও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যমুনা সেতু পশ্চিম থানা পুলিশ জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম বহনকারী গাড়িগুলো চলাচলের সময় মহাসড়কে সাধারণ যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবহনের জন্য বহরের জন্য একটি আলাদা লেন খালি রাখা হয়েছিল।
সকাল ৯টা ১০ মিনিটের দিকে ইউরেনিয়াম বহনকারী বহরটি যমুনা সেতু অতিক্রম করে। এরপর নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটি রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করে এই পারমাণবিক জ্বালানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্দিষ্ট বিশেষ শেডে সংরক্ষণ করা হবে। জ্বালানি সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হবে।
রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণ এবং দ্বিতীয় ইউনিটের চালুর প্রস্তুতির জন্য রাশিয়া থেকে মোট নয়টি চালানে পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে আনা হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ২০০টির বেশি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতির জন্য এই জ্বালানি আনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তি স্থাপনই নয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুরে ইউরেনিয়ামের ধারাবাহিক চালান পৌঁছানো প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের মাধ্যমে প্রকল্পটি ধীরে ধীরে উৎপাদনের প্রস্তুতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

