বঙ্গোপসাগর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর মতে, দেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে। একই অনুষ্ঠানে তিনি বিনিয়োগ, তরুণদের দক্ষতা, কৃষি, পানি নিরাপত্তা, পরিবেশ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন। এতে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ বক্তা, তিন শতাধিক প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন।

সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারা। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তিবিদেরাও আছেন। আয়োজক সিজিএস। আলোচনার মূল বিষয় পাঁচটি। এর মধ্যে আছে ভূরাজনীতি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবারস্পেস, বাণিজ্য ও সংযোগ এবং জলবায়ু, সহনশীলতা ও মানব নিরাপত্তা।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে অপার সম্ভাবনার কথা বলেন। তাঁর মতে, অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে আরও গভীর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা দরকার। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব। এতে নতুন বাজার খুলবে এবং তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরি হবে। সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ার কথাও বলেন তিনি।
তিনি জানান, বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বিশ্বাসী। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশটি সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। তাঁর ভাষ্য, শান্তি ও সম্প্রীতিই যৌথ সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন এলাকা হিসেবে দেখতে চান তিনি, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে এবং পারস্পরিক সমান সুবিধা পাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের ভূমিকা পালনে প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বাংলাদেশকে নিরাপদ বিনিয়োগের ঠিকানা এবং শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে গড়তে কাজ করছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ সব খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যের কথাও জানান তিনি। বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনি নীতির ধারাবাহিকতার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেবে।
তরুণদের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান জরুরি। সরকার ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্ট-আপকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তরুণেরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ‘ব্রেইন ড্রেন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপ দিক, এমন প্রত্যাশা তাঁর।
সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে তিনি জানান, কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অগ্রাধিকার পান। সরকার ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্যান্য কার্ডের সমন্বয়ে প্রত্যেক নাগরিককে একটি ইউনিভার্সেল কার্ড দিতে চায়। শিশুদের জন্য আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা নিশ্চিত করতে ইউনিফর্ম, মিড ডে মিলসহ নানা সুবিধার ব্যবস্থা হচ্ছে। তিনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথাও বলেন।
কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিশিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। তাঁর মতে, শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়তে পারে শক্তিশালী বাংলাদেশ।
পানি নিরাপত্তা নিয়ে তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা আছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কৃষিকে সহায়তা করবে এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াবে বলে তিনি মনে করেন।
পরিবেশ নিয়ে সরকারের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে। সৌরশক্তির সম্প্রসারণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনেও জোর দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড কারখানার মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে। পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর বর্জ্য কমাতে, জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। সরকার প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার করছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া চাই। তিনি এমন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ার কথা বলেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ এখনো প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং তাদের প্রত্যাবাসন জরুরি। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণের সমাধানও করতে হবে। তাঁর ভাষায়, যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও হতে হবে সেখানেই।
বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি, যা বিশ্বব্যাপী ‘ব্লু ইকোনমি’ নামে পরিচিত। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলসীমা মৎস্য, জ্বালানি, বন্দর ও পর্যটনে বড় সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বন্দরের সক্ষমতা, নৌপথের সংযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের বাধা কমানো জরুরি। শুধু আহ্বান নয়, এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ও সময়সীমা দেখার অপেক্ষায় থাকবেন বিনিয়োগকারীরা।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতির ধারাবাহিকতার কথা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অনিশ্চয়তাই বড় উদ্বেগ। সরকার বদলালেও নীতি যদি স্থিতিশীল থাকে, তবেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসে। এখানে ঘোষণার চেয়ে আইনি কাঠামো, শিল্পের জন্য অবকাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর কাজই বেশি নির্ণায়ক হবে।
কয়েকটি ঘোষণা বড় পরিসরের। পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও ২৫ কোটি গাছ লাগানো বিশাল কাজ। এসব বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ, জনবল ও তদারকি লাগবে। পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা আঞ্চলিক পানিবণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত, যা কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এগোনো কঠিন। তাই এগুলো কত দ্রুত বাস্তব রূপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
ইউনিভার্সেল কার্ড ও স্কুলে মিড ডে মিলের মতো উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষার পরিসর বাড়াতে পারে। তবে উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা এবং বাজেটের সংস্থান নিশ্চিত না হলে সুফল সীমিত থাকতে পারে। একইভাবে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের মান ও বাজারের চাহিদার মধ্যে মিল রাখা জরুরি। ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এর ধারণা তখনই কাজ করবে, যখন দেশেই মানসম্মত কাজের সুযোগ থাকবে।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখার প্রচেষ্টার অংশ। এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে প্রায় ১৩ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার চাপ অর্থনীতি ও স্থানীয় সমাজে পড়ছে। অর্থায়ন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যাবাসন মিয়ানমারের পরিস্থিতির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
এই সম্মেলনের মঞ্চ নিজেই একটি কূটনৈতিক সুযোগ। বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান ও সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। তবে এই বার্তা কতটা বাস্তব অংশীদারিত্বে রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।
সম্মেলন চলবে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত। এই সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও জলবায়ু নিয়ে কী ধরনের আলোচনা ও প্রতিশ্রুতি আসে, সেদিকে নজর থাকবে। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিতে রূপ পায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্যের প্রতিশ্রুতি বাস্তব ফলাফলে বদলাতে পারলেই বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সমৃদ্ধির এই রূপরেখা অর্থবহ হয়ে উঠবে।

