দেশের বাজারে রান্নার গ্যাস বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেসরকারি আমদানিকারকদের আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ শনিবার বেসরকারি এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে এক বৈঠকে এই নির্দেশ দেন। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় দেশের কয়েকটি শীর্ষ আমদানিকারকের বিরুদ্ধে এলপিজি মজুত করার অভিযোগ পাওয়ার পর।
তবে বৈঠকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো মজুতদারির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা সরকারের কাছে আশ্বস্ত করেছে যে, দেশের বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রান্নার গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলবে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করে নিয়মিত বাজারে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কয়েকটি এলপিজি কোম্পানির কাছে সেপ্টেম্বর মাসের বিক্রির তথ্য চেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড এলপিজি লিমিটেড, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি লিমিটেড, ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড এবং বিএম এনার্জি (বাংলাদেশ) লিমিটেড।
বিইআরসি জানতে চেয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে এসব প্রতিষ্ঠান অটো গ্যাস ব্যবহারকারী, শিল্প খাত এবং বোতলজাত এলপিজি গ্রাহকদের কাছে কত পরিমাণ গ্যাস বিক্রি করেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠান, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশ দেয়। সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশে এলপিজির কোনো প্রকৃত সংকট নেই এবং আমদানি দেশের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট রয়েছে।
এলওএবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর আগের মাস আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন। অর্থাৎ আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি কমেছে মাত্র ২ হাজার টন।
তবে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি করা হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি পাওয়া নিয়ে অভিযোগ বাড়ছে। অনেক ভোক্তার অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তাদের গ্যাস কিনতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরবরাহ সংকটের কারণে ভোগান্তিতেও পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিজি খাতে আবারও এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কয়েক মাস আগে দাম ও সরবরাহ নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছিল, তার পর নতুন করে বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি না করে অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ডিলারের দাবি, তারা আমদানিকারকদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছেন না। তবে আমদানিকারকরা এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, এলপিজি বাজারে আবারও একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে যদি বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি হতে পারে।
এর আগে এলপিজির দামের অস্থিরতার পর সরকার পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করেছিল। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর কাঠামোতেও পরিবর্তন আনে। উৎপাদন ও বাণিজ্য পর্যায়ের সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং আমদানির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ অগ্রিম কর বাতিল করে আমদানি পর্যায়ে সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর নির্ধারণ করা হয়।
সরকার এলপিজি আমদানিকারকদের জন্য আমদানি ও সংরক্ষণ সীমাও বাড়িয়েছে, যাতে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। রান্নার কাজে এবং যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত এই গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব উদ্যোগের পরও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এলপিজি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এখন সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা, নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং কোনো পক্ষ যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে না ফেলে তা নিশ্চিত করা।

