বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা এখন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। সীমিত জায়গা, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে দেশের কারা ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর দেশের ৭৫টি কারাগারে মোট বন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৭৭ জন। অথচ এসব কারাগারে বন্দি রাখার সরকারি অনুমোদিত সক্ষমতা মাত্র ৪৫ হাজার ১৮৬ জন।
অর্থাৎ, বর্তমানে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১৩৬ শতাংশ বেশি বন্দি রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে যেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানে দ্বিগুণের বেশি মানুষ অবস্থান করায় আবাসন, স্বাস্থ্য, খাবার, স্যানিটেশন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট বন্দির মধ্যে ৭১ হাজার ৮৫০ জন বিচারাধীন আসামি। যা মোট বন্দির প্রায় ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ২৫ হাজার ৪৬ জন, যা মোট বন্দির প্রায় ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় কারাগারে অবস্থান করছেন। ফলে বিচারাধীন বন্দিদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানও কারাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
কারা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তারা ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অতিরিক্ত বন্দির কারণে শুধু থাকার জায়গার সংকট নয়, চিকিৎসা সুবিধা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী সারা হোসেন মনে করেন, কারাগারে চিকিৎসার অভাব বা দেরিতে চিকিৎসা পাওয়ার কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঠেকাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
কারা অধিদপ্তর ও ঢাকা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে কারাগারে ৩১৪ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে কারা হেফাজতে মারা গেছেন মোট ১ হাজার ৩৩৯ জন।
বছরভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে ২৯১ জন, ২০২২ সালে ২১৩ জন, ২০২৩ সালে ৩৬৭ জন, ২০২৪ সালে ৩০৬ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬২ জন বন্দি কারা হেফাজতে মারা যান।
চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসকের সংকট। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স, কিন্তু বর্তমানে তাদের রয়েছে মাত্র ২৩টি।
ফলে অনেক সময় অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য পিকআপ ভ্যান ব্যবহার করতে হয়। এতে জরুরি চিকিৎসা পেতে দেরি হয় এবং ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সাবেক উপকারা মহাপরিদর্শক শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, জেলা কারাগার থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনার পথেই অনেক বন্দি মারা যান। এর পেছনে পরিবহন সমস্যা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামোর ঘাটতি বড় কারণ।
কারা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৮টি কারাগারের জন্য বেসামরিক সার্জন কার্যালয় থেকে ১০১ জন চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। অথচ অনুমোদিত চিকিৎসক পদের সংখ্যা ১৫১টি। কারা বিভাগের নিজস্ব চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুইজন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে ধারণক্ষমতা মাত্র ৪ হাজার ৫৯০ জন হলেও বর্তমানে বন্দি রয়েছে ১৩ হাজার ৯৩০ জন। অর্থাৎ, সেখানে অনুমোদিত সংখ্যার প্রায় তিন গুণ বন্দি অবস্থান করছে।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশে কারাগারের সংখ্যা ৬৮ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭৫ হয়েছে। সিলেট, ফেনী, খুলনা ও কিশোরগঞ্জে নতুন কারাগার স্থাপন করা হয়েছে। তবে বন্দির সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট হয়নি।
বর্তমানে কারাগারে বিশেষ নিরাপত্তা বা বিশেষ যত্নে থাকা বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন ১৭৯ জন। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ৩২ জন, সাবেক সংসদ সদস্য ৪৭ জন এবং সরকারি কর্মকর্তা ৯৭ জন রয়েছেন।
কারাগারের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝাতে ৪৭ বছর বয়সী মামুনুর রশীদের অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে। তিনি জানান, ২৬ সেপ্টেম্বর মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা পাওয়ার পর তিনি তিন দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জ কারাগারের একটি ভবনে প্রথমে তাকে প্রায় ২৩৮ জনের সঙ্গে রাখা হয়। পরে অন্য ভবনে স্থানান্তর করা হলে সেখানে প্রায় ১৩১ জন বন্দি ছিলেন।
তিনি বলেন, ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। অনেককে শরীর গুটিয়ে শুতে হতো। পাশাপাশি টয়লেট ব্যবহার এবং কারাগারের খাবার নিয়েও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত বন্দি শুধু ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়, এটি মানবাধিকারের সঙ্গেও জড়িত। পর্যাপ্ত ঘুম, খাবার, চিকিৎসা ও মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে বন্দিদের মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, মোবাইল কোর্ট আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো অভিযোগের কারণে মানুষ কারাগারে চলে যাচ্ছে, যা বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।
মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট জান্নাত-উল-ফারহাদও স্বীকার করেছেন, অতিরিক্ত বন্দির কারণে আবাসন, পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়।
মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, যেখানে কারাগারের ধারণক্ষমতা সীমিত, সেখানে বিচারাধীন ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন আটক রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আধুনিক কারা ব্যবস্থার জন্য নতুন আইন ও সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের কারাগার ব্যবস্থার বর্তমান সংকট মোকাবিলায় শুধু নতুন ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা, বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা বাড়ানো, চিকিৎসা সুবিধা উন্নত করা এবং কারাগার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার আনা।
কারাগারের উদ্দেশ্য শুধু বন্দিত্ব নয়, বরং সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু অতিরিক্ত বন্দির চাপ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

