বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাটের মংলায় পরিকল্পিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চীন।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের প্রথম ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর প্রযুক্তিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। মূলত মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করাই হবে এর প্রধান লক্ষ্য। তবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তির যুগে প্রবেশ করছে। এর বাইরে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে ছোট আকারের পারমাণবিক প্রযুক্তির সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে সরকার।
সম্প্রতি শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মধ্যেই চীনের পক্ষ থেকে মংলায় এসএমআর প্রকল্পের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর প্রচলিত বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় আকারে ছোট, তুলনামূলকভাবে সহজে স্থাপনযোগ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে ব্যবহারযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ এই প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এসএমআর প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহী এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, এসএমআর প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে মংলায় চীনের নির্দিষ্ট প্রস্তাব এখনো তার কাছে পৌঁছায়নি বলেও জানান তিনি।
চীনের এই প্রস্তাব নিয়ে গত আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং চীনের একটি প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের আটজন প্রতিনিধি এবং চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার কোঅপারেশন ওভারসিজ লিমিটেডের আটজন কর্মকর্তা অংশ নেন।
বৈঠকে চীনের চারজন বিশেষজ্ঞ এসএমআর প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে উপস্থাপনা করেন এবং বাংলাদেশ সরকারের মতামত জানতে চান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক আলোচনায় প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জমি বিনামূল্যে দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকল্পে স্থানীয় কর্মীদের নিয়োগের বিষয়েও আগ্রহ দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে পারমাণবিক প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া মংলা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের বিষয়েও চীনের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, মংলা অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদা, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্প্রসারণের জন্য নতুন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎস প্রয়োজন। ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই চাহিদা পূরণে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হতে পারে।
তবে পারমাণবিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং নিরাপত্তার দিকগুলো গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
মংলায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচির বিস্তারের একটি নতুন ধাপ হতে পারে। রূপপুরের পর ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

