ঢাকার গণপরিবহনে চালক ও সহকারীর সংকট ক্রমেই বাড়ছে। অনেক শ্রমিক বাসের চাকরি ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন। কারণ, টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করেও বাসে দিনে হাজার টাকা আয় করা কঠিন। অথচ রিকশা চালিয়ে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বা তার বেশি আয় সম্ভব বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা। এর ফলে অনেক মালিক পর্যাপ্ত বাস রাস্তায় নামাতে পারছেন না। যেগুলো চলছে, সেগুলোর জন্যও কর্মী জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
রাজধানীতে বাসের সংখ্যা নিয়ে তথ্যে ভিন্নতা আছে। ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের আনুমানিক হিসাবে, প্রধান টার্মিনালগুলো ঘিরে প্রায় ১০ হাজার বাস চলে। এসব বাসের জন্য চালক, সহকারী ও কন্ডাক্টর মিলিয়ে অন্তত ৬০ হাজার শ্রমিক দরকার। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্যে বৃহত্তর ঢাকায় সক্রিয় রুট ৯০টি। এর মধ্যে ৬১টিতে চলছে ৪ হাজার ৬৪৫টি বাস। ডিটিসিএ কর্মকর্তাদের ধারণা, সব রুট মিলিয়ে সক্রিয় বাসের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশা বেড়েছে কোনো তদারকি ছাড়াই। কেন্দ্রীয় নিবন্ধন না থাকায় এ যানের সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, রাজধানীতে ব্যাটারি রিকশার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এর সংখ্যা বেড়েছে ৫০০ শতাংশ। গত এক বছরেও একই হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের গবেষকেরা। বাস ও রিকশার সংখ্যার এই বিশাল ব্যবধানই বলে দেয়, সড়কের পরিস্থিতি কতটা অসম হয়ে উঠেছে।
পেশা বদলের সবচেয়ে বড় কারণ আয়। ঢাকার বাস রুট ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম বলেন, তাঁদের জরিপে দেখা গেছে, বাসচালক বা সহকারী টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করেও হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারেন না। প্রত্যাশিত আয়ের অভাব, যানজটের ভোগান্তি, সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং যাত্রীদের হয়রানি মিলিয়ে মানুষ এ পেশা ছাড়ছেন। তবে কতজন শ্রমিক বাস ছেড়ে রিকশায় গেছেন, তার কোনো পরিসংখ্যান মালিকপক্ষ বা খাতসংশ্লিষ্টরা দিতে পারেননি। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা যে নিয়মিত ঘটছে, তা তাঁরা অকপটে স্বীকার করছেন।
ঠিকানা পরিবহনের মালিক বেলায়েত হোসেন বলেন, বাসে সারা দিন খেটে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করাই এখন কঠিন। তাঁর কোম্পানির শতাধিক বাস থাকলেও কর্মী সংকটে প্রতিদিন নামানো যাচ্ছে ৮০-৯০টি। আমিনবাজার থেকে আরিচা সড়কের নানা জায়গায় শ্রমিকের অভাবে ঠিকানার অনেক বাস অলস পড়ে থাকছে। অর্থাৎ সংকটের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি মালিকদেরও হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাটারি রিকশার আকর্ষণ আয় ও কাজের স্বাধীনতায়। বাসের চাকরিতে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম বা আয়ের নিশ্চয়তা নেই। রিকশায় কাজের সময় অনেকটাই নিজের হাতে। পুরো দিন চালালে গড়ে প্রায় ২ হাজার এবং অর্ধদিবসে প্রায় ১ হাজার টাকা আয় সম্ভব। গ্যারেজ ভাড়া, বিদ্যুতের চার্জ, স্থানীয় জমা ও সমিতির চাঁদা বাদ দিয়েও কোনো কোনো চালক মাসে ২০ হাজার টাকা বা তার বেশি হাতে রাখতে পারেন। কেউ নিজের রিকশা চালান, কেউ দৈনিক ভাড়ায়। একটি রিকশার দাম আনুমানিক ৮০ হাজার টাকা। ঋণ বা কিস্তিতেও কেনা যায়। তবে প্রকৃত আয় মালিকানা, ভাড়া ও অন্যান্য খরচের ওপর নির্ভর করে। ফলে সবাই একই পরিমাণ আয় করছেন, এমন ভাবার সুযোগ নেই।
বাসচালক মো. হামিদ ছয় মাস ধরে ব্যাটারি রিকশা চালাচ্ছেন। তেজগাঁও এলাকায় তিনি জানান, বাসচালকের কাজে সম্মান নেই, আয়ও খুব কম, অথচ সারা দিন অনেক পরিশ্রম করতে হয়। রিকশা চালানো শুরুর পর পরিশ্রম কমেছে, আয়ও বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শুধু টাকার হিসাব নয়, সড়কের নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তির হাতছানিও অনেককে টানছে। শ্রমিক নেতা আবুল কাশেম বলেন, বাসচালকদের নির্দিষ্ট স্টপেজে থামতে হয়, নিয়ম মেনে যাত্রী ওঠানো-নামানো ও ট্রাফিক আইন মানতে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই বলে চালকদের একাংশ যেখানে-সেখানে থামছেন, যাত্রী তুলছেন। আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহির এই ফারাক পেশা বদলের একটি কারণ। অনেকের কাছে এটি শুধু বেশি আয়ের প্রশ্ন নয়, কঠিন কর্মপরিবেশ ও নানা বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে আসারও পথ।
বাসের কর্মপরিবেশও প্রতিকূল। চালক ও সহকারীদের ইঞ্জিনের পাশে প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে হয়। শ্রমিকদের অভিজ্ঞতায়, গ্রীষ্মে সেখানে তাপমাত্রা ৪৫-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, ঝাঁকুনি ও বিশ্রামের অভাবে অনেকে কোমর ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগেন। কাজের ফাঁকে শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগও সব সময় মেলে না। এক-দুই দিন বিশ্রাম নিলে অনেক ক্ষেত্রে সেই সময়ের কোনো বেতন মেলে না। বেশি আয় করতে গিয়ে আবার বাড়তি চাপেও পড়তে হয়।
বাস পরিচালনার পদ্ধতি বদলে যাওয়ায় শ্রমিকদের চাপ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ওয়েলকাম ট্রান্সপোর্টের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে চলছে ৪৫-৫০টি বাস। ৪৫টির জন্য অন্তত ৯০ জন চালক ও ৯০ জন সহকারী লাগলেও পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী মিলছে না। তাঁর ভাষ্য, আগে ওয়ে বিলভিত্তিক ব্যবস্থায় বাসের চলাচল অনুযায়ী শ্রমিকেরা নির্দিষ্ট আয়ের সুযোগ পেতেন। সেই ব্যবস্থা উঠে গিয়ে চুক্তিভিত্তিক পরিচালনা বাড়ায় অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। যানজটে ট্রিপ কমে গেলে মালিকের দৈনিক জমা মিটিয়ে নিজের আয় নিশ্চিত করা চালকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি দক্ষতা ও পেশাগত আচরণ নিয়েও উদ্বেগ জানান। তাঁর মতে, কিছু চালকের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
ব্যাটারি রিকশার বিশৃঙ্খল চলাচল সামলাতে সরকারি সংস্থাগুলো এখন নীতিগত উদ্যোগ নিচ্ছে। ২৯ সেপ্টেম্বর তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএর সমন্বয় সভায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আছে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পর্যায়ক্রমে চলাচল নিয়ন্ত্রণ, এলাকাভিত্তিক জোন নির্ধারণ, নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ড চালু এবং ডিজিটাল পারমিটের সম্ভাব্যতা যাচাই। এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বর পরিবহন মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। জোনভিত্তিক নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা চলতে পারবে, তবে মূল সড়কে চলতে দেওয়া হবে না।
তবে শুধু নিয়ন্ত্রণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে এলে বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও যানজটের চাপ কমবে, বাড়বে বাসের ট্রিপ। কিন্তু চালকের আয়, কাজের সময়, বিশ্রাম ও পেশাগত নিরাপত্তার প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে শ্রমিকদের বাসে ফেরানো কঠিন হবে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। রিকশা সরালেই বাসের শ্রমিক ফিরবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, শ্রমিকদের অসন্তোষের মূল জায়গা আয় ও কর্মপরিবেশ, যা রিকশা নিয়ন্ত্রণে বদলায় না।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, বাসচালকদের রিকশায় চলে যাওয়ার মূল কারণ বাসের চাকরিতে বেতন, চাকরি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার চরম অভাব। তাঁর ভাষ্য, চুক্তিভিত্তিক চালনায় তীব্র মানসিক চাপ থাকে। বিপরীতে রিকশায় কম পরিশ্রমে বেশি আয়, কাজের স্বাধীনতা ও আইনি-সামাজিক চাপের অভাব রয়েছে। হাতিরঝিল বা ঢাকা চাকার মতো যেসব জায়গায় নির্দিষ্ট বেতন ও নিরাপত্তা আছে, সেখানকার চালকেরা রিকশা চালাতে যান না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অধ্যাপক হকের আশঙ্কা, সহজ আয়ের এই আকর্ষণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কৃষি ও গার্মেন্টস খাত থেকেও শ্রমিকেরা রিকশায় ঝুঁকতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, মেগা অবকাঠামো বা মেট্রোরেল দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবহন খাতের সংস্কারই হওয়া উচিত সরকারের এক নম্বর অগ্রাধিকার, আর সেটি হতে হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। তাঁর মতে, বাস খাতকে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির আওতায় এনে চালকদের নির্ধারিত বেতন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও চাকরির স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। হাতিরঝিল ও ঢাকা চাকার উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, নির্ধারিত বেতন ও নিরাপত্তা থাকলে শ্রমিকদের ধরে রাখা সম্ভব।
শ্রমিকদের কথাতেও সংকটের চিত্র স্পষ্ট। ভিক্টর পরিবহনের চালক মো. নয়ন বলেন, বাস চালিয়ে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়, ট্রিপ কম হলে আয়ও কমে যায়। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালালে প্রতিদিন টাকা হাতে পাওয়া যায়, নিজের সুবিধামতো কাজও করা যায়। তাঁর মতে, আয় ভালো হলে এবং কাজের পরিবেশের উন্নতি হলে অনেকেই আবার বাস চালানোর কথা ভাববেন।
সব মিলিয়ে গণপরিবহনে চালক-সহকারীর সংকট কেবল কর্মী না পাওয়ার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাস পরিচালনার পদ্ধতি, যানজট, শ্রমিকের আয় ও কর্মপরিবেশ। একদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় শৃঙ্খলা আনা, অন্যদিকে বাস শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য আয় ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা, দুই দিকেই কার্যকর উদ্যোগ না এলে ঢাকার গণপরিবহনে শ্রমিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

