লোহাগাড়ার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে সড়ক সম্প্রসারণ, আলোকসজ্জা ও রেল অবকাঠামোর কারণে হাতির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একটি অংশ চার লেনে উন্নীত করার কাজে সাতঘর করিডরের গুরুত্বপূর্ণ পথ প্রায় দুই মাস ধরে কার্যত বন্ধ। এতে হাতির ঐতিহ্যবাহী পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ৯০০ মিটার অংশ প্রশস্ত করার কাজ চলছে। এ কারণে সাতঘর হাতি করিডরের একটি প্রধান পারাপারের স্থান আটকে গেছে। সড়কের দুই পাশের বনাঞ্চলের মধ্যে হাতি আর স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে পারছে না।
চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নূর জাহান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, গত দুই মাস ধরে হাতি পূর্ব দিকের বান্দরবানসহ পাহাড়ি এলাকা থেকে পশ্চিমের সংরক্ষিত বনে যেতে পারছে না। সড়কের দুই পাশে মাটি কাটা হচ্ছে, শ্রমিকরাও কাজ করছেন। করিডরের দুই পাশে হাতির পাল এলেও তারা পার হতে পারছে না। বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেড় বছর আগে থেকেই চুনতি মহাসড়কের ওভারপাস এলাকায় আলোকসজ্জা ও সাইনবোর্ডের কারণে হাতির চলাচল অনেকটা কমে গিয়েছিল। সড়কের কাজের প্রভাব পড়েছে রেলপথেও। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে হাতির জন্য বানানো একটি ওভারপাস ও দুটি আন্ডারপাসে যাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রেলপথটির প্রায় ২৭ কিলোমিটার সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে গেছে।
নূর জাহান বলেন, খাবারের খোঁজে স্বাভাবিক পথে চলতে না পেরে হাতি এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ধানখেতেও ঢুকছে হাতি। এ অবস্থায় সড়ক বিভাগকে কাজ দ্রুত শেষ করার অনুরোধ জানিয়েছে বন বিভাগ। ভবিষ্যতে মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত হলে হাতির নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য সেখানে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিও তুলেছে সংস্থাটি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পরিবেশগত সুরক্ষা পরামর্শক আসিফ ইমরান জানান, বন বিভাগের সাতঘর বিট অফিসের সীমানা ও আলোকসজ্জার কারণে প্রায় আট মাস এই করিডরে হাতি চলাচল করেনি। পশ্চিমে বান্দরবান ও পূর্বে চুনতি, দুই দিকের হাতিই এই পথ ব্যবহার করেনি। পূর্ব দিকের পালের যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে পশ্চিম দিকের হাতিগুলো আন্ডারপাস ও ওভারপাস ব্যবহার করছে।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, বাঁশখালী এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ১৯ হাজার ১৮৫ একর জুড়ে বিস্তৃত। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় গর্জনগাছপ্রধান এই বনে এখন গুটিকয়েক গর্জনগাছ অবশিষ্ট আছে। এলাকাটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের এশীয় হাতির অন্যতম প্রধান আবাসস্থল। বর্তমানে এখানে ৪০ থেকে ৫০টি হাতি আছে। এগুলো তিন উপজেলার বনে চলাচল করে এবং বিভিন্ন স্থানে রেললাইন পার হয়।
২০১৬ সালে রেলপথ নির্মাণের জন্য চুনতি ও ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের ২৭৬ একর বনভূমি অবমুক্ত করে সরকার। সেখানে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ কাটা হয় এবং ২৬টি পাহাড়ের আকৃতি বদলে ফেলা হয়। ২০১৮ সালের মার্চে রেলপথ প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং গত বছর তা শেষ হয়।
একই বছর আইইউসিএন তিনটি বনের ২৭ কিলোমিটার রেলপথে হাতির চলাচল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করে। তাতে হাতির যাতায়াতের ১৬টি করিডর চিহ্নিত হয়। খাবার ও পানির খোঁজে এক আবাসস্থল থেকে আরেকটিতে যেতে হাতি এসব পথ ব্যবহার করে।
কিন্তু ২০১৮ সালে জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব মূল্যায়নে এডিবির বেসলাইন বায়োডাইভারসিটি অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে মাত্র একটি ওভারপাস ও দুটি আন্ডারপাস নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, হাতি বিশেষজ্ঞ ও বন কর্মকর্তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে এই সুপারিশ করা হয়েছিল। শুরু থেকেই তারা বলে আসছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের তৈরি এই তিনটি পারাপার অপ্রতুল।
আইইউসিএনের হাতি চলাচলের পথ চিহ্নিতকরণ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ও হাতি বিশেষজ্ঞ এইচ এম রায়হান সরকার আগে সতর্ক করেছিলেন, পারাপারের পথ কমে যাওয়ায় হাতি ও ট্রেনের সংঘর্ষের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তার মতে, এক দশকের মধ্যে এশীয় হাতির অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে।
হাতির আচরণ পর্যবেক্ষণেও বড় বাধা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইনে না উঠে আন্ডারপাস, ওভারপাস বা কালভার্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হাতির সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। তাই নিয়মিত নজর রাখা জরুরি। অথচ এ কাজে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা বারবার ভাঙা হচ্ছে।
২০২৫ সালের আগস্টে এক রাতেই সাতটি ক্যামেরা নষ্ট করা হয়। গত তিন মাসে একটি আন্ডারপাসের দুটি ক্যামেরা ভেঙেছে। সাত মাস আগে ওভারপাসের ক্যামেরাও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। আসিফ ইমরানের ভাষ্য, গত দুই বছরে ডাকাতরা বারবার ক্যামেরা নষ্ট করছে, যাতে তাদের চেহারা ধরা না পড়ে। এতে হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে, যা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্ঘটনা ঠেকাতে রেলপথের চুনতি অংশের দুই পাশে মোট আট কিলোমিটার আরসিসি ফেন্সিং করা হয়েছে। ফেন্সিংয়ের শেষ অংশ কালভার্টের প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত, যাতে হাতি রেললাইনে উঠতে না পারে। আসিফ ইমরান জানান, শুরুতে হাতি ফেন্সিংয়ের দেয়ালে ধাক্কা দিত, কাদা ও বর্জ্যের চিহ্ন পাওয়া যেত। এখন তারা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হচ্ছে। দেয়ালে ধাক্কা না দিয়ে ফেন্সিং ধরে হেঁটে নির্দিষ্ট পারাপারের পথ খুঁজে নিচ্ছে।
রেলওয়ে ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এক বছর না পেরোতেই ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর লোহাগাড়ার চুনতি অভয়ারণ্যে এলিফ্যান্ট ওভারপাসের উত্তর পাশে ট্রেনের ধাক্কায় আহত হয়ে একটি হাতিশাবক মারা যায়। বনের ভেতরে ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার নির্ধারিত।
গত বছরের ২২ জুলাই রাতে আরেকটি দুর্ঘটনা অল্পের জন্য এড়ানো যায়। হাতির একটি পাল রেললাইনে উঠে এলে লোকোমাস্টার দূর থেকে তা দেখে জরুরি ব্রেক কষে ট্রেন থামান। বারবার হুইসেল দেওয়ার একপর্যায়ে পালের একটি হাতি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের শেষ বগিতে ধাক্কা দেয়। দ্রুত ট্রেন চালু করায় বড় ক্ষতি হয়নি।
বর্তমানে কক্সবাজার রুটে দিনে ও রাতে চার জোড়া ট্রেন চলে। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ জোড়ায় উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। ট্রেন বাড়লে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক আশঙ্কা।
এই ঝুঁকি ঠেকাতে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে এআই-চালিত সিগন্যাল প্রযুক্তির ছয়টি রোবোটিক ও সেন্সর ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রেল কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাবিত ক্যামেরা হাতি শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ছবিসহ সংকেত পাঠাতে পারবে। হাতি বা পাল রেললাইনে উঠলে পাশের লাল বাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলবে। এতে লোকোমাস্টার ৫০০ থেকে ৭০০ মিটার দূর থেকে হাতির উপস্থিতি বুঝবেন এবং ২২০ মিটার দূর থেকে ব্রেক করার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু এ ব্যবস্থা বসানো ছাড়াই গত বছর দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শেষ করা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের এই প্রযুক্তি স্থাপনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এডিবির অর্থায়নে চলমান চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্পে এআই ক্যামেরা যুক্ত করতে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে। তবে বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
তাই অন্তর্বর্তী সময়ে রেলপথে ওয়েম্যান নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ২৭ কিলোমিটার পথে মোট ২০ জন ওয়েম্যান দায়িত্ব পালন করবেন। টহলের সময় তাদের কাছে হাতি সরানোর বিশেষ মাইক বা সাউন্ড মেকার এবং ট্রেন থামানোর জন্য লাল পতাকাসহ সংকেত দেওয়ার সরঞ্জাম থাকবে। তবে এখনো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে চুনতির হাতি এখন একসঙ্গে সড়ক, রেল ও আলোর চাপে পড়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার মধ্যে সমন্বয় না হলে লোকালয়ে হাতির ঢুকে পড়া এবং ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা, আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বসানো এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সচল রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

