ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য শিশুদের প্রস্তুত করতে স্কুল পর্যায় থেকেই অতিরিক্ত একটি বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষায় দক্ষতা থাকলে শিশুরা ভবিষ্যতে বিদেশে পড়াশোনা এবং কর্মক্ষেত্রে অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান ও জাপানিসহ কয়েকটি ভাষার মধ্য থেকে শিক্ষার্থীরা নিজের পছন্দমতো একটি ভাষা বেছে নিতে পারবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’। অনুষ্ঠানে তিনি শিশুদের প্রতিভা বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীলতা নিয়ে কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সেই গুণ বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। তাঁর মতে, দেশের বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে নিজ উদ্যোগে সন্তানদের জন্য এসব সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরাও যাতে শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলাধুলার সুযোগ পায়, সে জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই এসব সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিজের গিটার ও কিবোর্ড শেখার আগ্রহের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের উদ্দেশে বলেন, যারা গিটার, হারমোনিয়াম, বাঁশি বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে ভালোবাসে, তাদের তা সম্পূর্ণভাবে ও ভালোভাবে শিখতে হবে। যারা গান বা নাচে আগ্রহী, তাদেরও সেই প্রতিভা বিকাশে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একইভাবে যারা কেরাত ও কোরআন তেলাওয়াত পছন্দ করে, তাদের সেটি সুন্দরভাবে রপ্ত করার পরামর্শ দেন।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়েও কথা বলেন সরকারপ্রধান। তিনি জানান, এ-সংক্রান্ত প্রস্তুতিমূলক কাজ মোটামুটি গুছিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৭ অথবা ২০২৮ সাল থেকে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গান, বাদ্যযন্ত্র ও খেলাধুলার বিভিন্ন ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের শুধু পড়াশোনা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি বা ভাষাজ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না; তাদের মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে। দেশের প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতিও তাদের মানবিক হতে হবে। তিনি শিশুদের বাড়ি, স্কুল ও আশপাশের এলাকার গাছের যত্ন নিতে এবং পশুপাখির প্রতি সদয় হতে আহ্বান জানান। প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।
বিশ্লেষকদের মতে, স্কুল পর্যায়ে তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি তরুণদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে জার্মান, জাপানিজ ও আরবি ভাষা জানা কর্মীর চাহিদা বিদেশের শ্রমবাজারে ও উচ্চশিক্ষায় রয়েছে। তবে উদ্যোগটি সফল করতে প্রয়োজন হবে প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযুক্ত পাঠ্যক্রম ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। বিশেষ করে গ্রামের স্কুলগুলোতে এসব সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরির ঝুঁকিও থেকে যায়। তাই ২০২৭ বা ২০২৮ সালে বাস্তবায়ন শুরুর আগে শিক্ষক প্রস্তুতি ও সম্পদ বণ্টনের স্পষ্ট পরিকল্পনা জরুরি।
শিল্প, সংগীত ও খেলাধুলার সুযোগ স্কুল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষক নিয়োগ, বাদ্যযন্ত্র ও খেলার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নিয়মিত তদারকির ওপর। পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শিশুদের সুষম বিকাশে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

