ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব এখন সরাসরি পড়তে শুরু করেছে দেশের কৃষিখাতে। আগে থেকেই সার, বীজ, সেচ, শ্রম ও কৃষিযন্ত্রের বাড়তি ব্যয়ে চাপে থাকা কৃষকদের জন্য নতুন এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
সরকার ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে। কৃষিতে সেচ ও পরিবহনের জন্য ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এ সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু জ্বালানির খরচে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সেচের পানি, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং কৃষি উপকরণের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
কৃষকেরা এমন এক সময়ে এই বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন, যখন সারের উচ্চমূল্য, বীজের দাম, সেচ ব্যয় এবং উৎপাদনের পর ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ আগে থেকেই রয়েছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে কৃষকের আয় বাড়ছে না।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের কৃষি ভর্তুকির কিছু চাপ কমতে পারে, কিন্তু এর বিপরীতে পুরো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান মনে করেন, জ্বালানির বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত কৃষক, পরিবহনকারী, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—সব পক্ষের ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে।
তাঁর মতে, বেসরকারি সেচপাম্পের মালিকরা ডিজেলের বাড়তি খরচ কৃষকের কাছ থেকেই আদায় করবেন। একইভাবে পরিবহনকারী ও বীজ ব্যবসায়ীরাও নিজেদের বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন। ফলে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হতে পারে।
সমস্যা হলো, উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষকের হাতে ফসল বিক্রির সময় একই হারে দাম বাড়ে না। অনেক ক্ষেত্রেই মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে ধান, আলু, সবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম কমে যায়। এতে কৃষক উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারেন না।
উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা এই পরিস্থিতিতে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে খরাপ্রবণ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপের ব্যবহারও বেশি। একই সঙ্গে জমি চাষ, ধান কাটা ও মাড়াইয়েও ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কৃষক আবদুল্লাহ বিন সাফি জানিয়েছেন, গত বোরো মৌসুমে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে তাঁর প্রায় ৫ হাজার টাকার ডিজেল লেগেছিল। এবার একই জমিতে সেই ব্যয় ৭ হাজার টাকার বেশি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
তার ওপর ধানের বিক্রয়মূল্যও কৃষকের পক্ষে যাচ্ছে না। তিনি চলতি বছরে আমন ধান বিক্রি করেছেন মণপ্রতি ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায়, যেখানে গত মৌসুমে একই ধানের দাম ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা।
অর্থাৎ একদিকে উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্রির দাম কমছে। এই দ্বিমুখী চাপ কৃষকের লাভের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত করছে।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কৃষক বেলাল হোসেনের হিসাব পরিস্থিতির আরেকটি কঠিন চিত্র তুলে ধরে। তিনি প্রতি বিঘা জমি ২০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। সেই জমি থেকে ১৫ মণ ধান উৎপাদন করে মণপ্রতি ৯০০ টাকায় বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ কেবল জমির ইজারা খরচের তুলনায়ই তাঁর আয় ৬ হাজার ৫০০ টাকা কম।
এর সঙ্গে যদি বীজ, সার, সেচ, শ্রম, জমি প্রস্তুত এবং ফসল কাটার খরচ যোগ করা হয়, তাহলে লোকসানের পরিমাণ আরও অনেক বেশি দাঁড়ায়।
রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় গত বছর প্রায় ৫ দশমিক ১ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমিতে সরাসরি ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ দিয়ে সেচ দিতে হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, রবি ও খরিফ মৌসুমে এই অঞ্চলের কৃষিখাতে ১২ কোটির বেশি লিটার ডিজেল ব্যবহার হয়। ফলে প্রতি লিটারে ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধি হলে সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
সিরাজগঞ্জের কৃষকদের হিসাবে, বীজ রোপণ থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৩৩ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। উল্লাপাড়ার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থাকা অবস্থায় জ্বালানি খরচ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টাকা। এখন ১৩৫ টাকা লিটার দরে সেই খরচ বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৪৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে কৃষকের খরচ শুধু এই বাড়তি ডিজেলমূল্যের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। পাম্প মালিক, যন্ত্রচালক এবং পরিবহনকারীরা নিজেদের পরিচালন ব্যয়ও পুনর্নির্ধারণ করছেন।
ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষক মান্নান মাতুব্বর জানিয়েছেন, সেচপাম্প মালিকরা প্রতি বিঘায় সেচের খরচ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে পাওয়ার টিলার ও হারভেস্টার চালকরাও ভাড়া বাড়িয়েছেন।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কৃষক সাইদুর খান জানিয়েছেন, সবজি চাষের জন্য জমি প্রস্তুতের ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। মাত্র এক মাস আগে এক বিঘা জমি প্রস্তুতের জন্য পাওয়ার টিলারের ভাড়া ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা। এখন সেই একই কাজের জন্য ৪ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে।
কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরাও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। এসব এলাকায় সেচ, যন্ত্রপাতি ও কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় আগামী মৌসুমে চাষের পরিকল্পনা নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কৃষি উৎপাদনের পর ফসল বাজারে নেওয়ার ব্যয়ও বেড়েছে। কুষ্টিয়ার চালকল মালিক সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এক ট্রাক চাল ঢাকায় পাঠাতে আগে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন একই পরিবহন খরচ বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে।
পরিবহন ব্যয় বাড়লে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ওপর থাকে না। চালকল, পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার কাছেও সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পৌঁছে যায়। এ কারণেই ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্যের বাজারে নতুন মূল্যচাপ তৈরির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার কৃষক আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, শিগগিরই বোরো বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে তিনি এবার বোরো চাষ করবেন কি না, তা নিয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
এ ধরনের দ্বিধা যদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
ক্ষুদ্র কৃষকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের ‘অ্যাগ্রিকালচারাল বাজেটিং ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক আউটলুক ২০২৬’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে কৃষিপণ্যের অস্থির দাম কৃষকের লাভ কমিয়ে দিচ্ছে।
গবেষণাটিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে বোরো ধানের উৎপাদন খরচ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে ধান, আলু, সবজি ও পেঁয়াজের মতো কৃষিপণ্যের খামার পর্যায়ের দাম অনেক ক্ষেত্রে এত কম থাকে যে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারেন না। এতে বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকদের একটি অংশ কৃষিকাজ ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান গওহর নঈম ওয়ারা বলেছেন, অনেক প্রান্তিক কৃষক জমির মালিকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে চাষ শুরু করেন। কিন্তু সেই অর্থেও পুরো উৎপাদন খরচ মেটে না। ফলে তাঁদের ঋণ নিতে হয়।
ডিজেলের দাম বাড়ায় এখন ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করাও অনেক কৃষকের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান জানান, আলু চাষে বড় ধরনের লোকসানের পর তিনি ধান থেকে সেই ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠার আশা করেছিলেন। কিন্তু ধান বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি। এখন আগামী বোরো মৌসুমে চাষ করতে তাঁকে আবারও ঋণ নিতে হবে।
এই পরিস্থিতি কৃষিখাতের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। কারণ কৃষক যদি ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন ব্যয় তুলতে না পারেন, তাহলে শুধু তাদের আয়ই কমবে না, ভবিষ্যতে চাষের আগ্রহও কমে যেতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সাইদুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, কৃষকেরা এমনিতেই আর্থিক সংকটে আছেন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর যদি মাত্র ১০ শতাংশ কৃষকও একটি মৌসুমের জন্য চাষ বন্ধ করেন, তাহলে তার প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
এই আশঙ্কা মূলত খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের কৃষি উৎপাদন কমে গেলে বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ কমতে পারে, যার ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তখন সরকারকে খাদ্য আমদানি, ভর্তুকি বা বাজার নিয়ন্ত্রণে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে ডিজেলের দাম বাড়িয়ে সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমলেও দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে অর্থনীতির ওপর আরও বড় বোঝা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা সেই খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফসলের দাম পাচ্ছেন কি না। যদি উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে কিন্তু বিক্রয়মূল্য একই থাকে বা কমে যায়, তাহলে কৃষকের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
ডিজেলের নতুন মূল্য কৃষকের জন্য তাই শুধু জ্বালানির বাড়তি খরচ নয়। এটি সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাড়াই, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ—সব পর্যায়ে ব্যয় বাড়ানোর একটি ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করছে।
এর সঙ্গে আগে থেকেই বেশি থাকা সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমের ব্যয় যোগ হওয়ায় আগামী বোরো মৌসুম কৃষকদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত দেশের কৃষিখাতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার এলাকায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষকের উৎপাদন খরচ, বাজারমূল্য এবং লাভের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে এই চাপ শেষ পর্যন্ত শুধু কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব খাদ্যের সরবরাহ, বাজারদর এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়তে পারে।
ফলে সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা, কৃষি উপকরণের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। তা না হলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

