আগামী বছরের পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই তিন ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জানুয়ারিতে দুই ধাপ এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আরেক ধাপে ভোট হতে পারে। এই তিন ধাপে ২ হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে এখনো চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা হয়নি।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপের ভোট জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে ৩ জানুয়ারিকে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ধরা হলেও এখন সেই সময়সূচি কয়েক দিন পেছানোর চিন্তা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন জানুয়ারির চতুর্থ সপ্তাহে এবং তৃতীয় ধাপের ভোট ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতি ধাপে আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হতে পারে। ফলে তিন ধাপ মিলিয়ে দুই হাজারের বেশি ইউপির নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, রমজানের আগেই তিন ধাপের ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা মোটামুটি নিশ্চিত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ২ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ এই তিন ধাপের আওতায় আসতে পারে, যদিও এই সংখ্যা ২০০টির মতো কমবেশি হতে পারে।
দেশে বর্তমানে মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩ হাজার ৬৩টির মেয়াদ শেষ হবে। আরও ১ হাজার ৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে। ফলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার আইনে ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। কোনো পরিষদ ভেঙে দেওয়া হলে পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যেও নির্বাচন করতে হয়। মধ্যবর্তী সময়ে প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইসির পরিকল্পনা অবশ্য গত কয়েক সপ্তাহে একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কমিশন প্রথমে সাত ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল এবং ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের সম্ভাব্য তারিখও জানিয়েছিল।
এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার আগে সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি। সরকার বলেছিল, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাজেট, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
এই অবস্থায় আগের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে কমিশন। পরে আন্তমন্ত্রণালয় আলোচনায় দেখা যায়, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় নির্বাচন আয়োজনের সময় সীমিত। জানুয়ারিতে কিছুটা সুযোগ থাকলেও ফেব্রুয়ারির শুরুতে রমজান এবং এরপর এসএসসি পরীক্ষা রয়েছে।
এ কারণে রমজানের আগে যত বেশি সম্ভব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। আর বাকি নির্বাচনগুলো এসএসসি পরীক্ষা শেষে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগের সময়ের মধ্যে আয়োজনের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ১ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।
ইসি ও সরকারের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো সব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সম্ভাব্য সময়সূচি, ভোটের ধাপ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এবার তফসিল ঘোষণার সময়েও কিছু পরিবর্তনের চিন্তা করছে কমিশন। সাধারণত ভোটের ৪৫ থেকে ৫০ দিন আগে তফসিল দেওয়া হয় এবং প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ২১ দিন প্রচারের সুযোগ পান।
তবে এবার ভোট গ্রহণের প্রায় ৩৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা এবং প্রচারের জন্য প্রায় ১৫ দিন সময় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এভাবে তুলনামূলক কম সময়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা থাকতে পারে।
কোন কোন ইউনিয়ন প্রথম ধাপে নির্বাচন করবে, সেটিও এখনো চূড়ান্ত নয়।
প্রাথমিকভাবে জেলার সদর উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদ একসঙ্গে প্রথম ধাপে ভোটের আওতায় আনার চিন্তা ছিল। পরে একটি বিভাগের সব জেলার ইউনিয়ন পরিষদ একসঙ্গে নির্বাচন করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।
এর পেছনে মূল যুক্তি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা। একটি নির্দিষ্ট বিভাগে একসঙ্গে নির্বাচন হলে অন্য বিভাগ থেকে পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট জনবল এনে নিরাপত্তা জোরদার করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সাধারণত অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ প্রার্থীরা স্থানীয় হওয়ায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের প্রভাব বেশি থাকে এবং ভোটার উপস্থিতিও তুলনামূলক বেশি হয়।
এই বাস্তবতায় সহিংসতা প্রতিরোধকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসি সূত্রে বলা হয়েছে, প্রথম ধাপের নির্বাচন যতটা সম্ভব নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আয়োজনের চেষ্টা থাকবে। প্রথম ধাপে কোনো বড় অনিয়ম বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে পরের ধাপগুলোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হতে পারে।
প্রয়োজন দেখা দিলে পরবর্তী ধাপে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে তার ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতাই পরের ধাপের প্রস্তুতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউপি নির্বাচনের পাশাপাশি পৌরসভা নির্বাচন নিয়েও পরিকল্পনা করছে কমিশন।
জানুয়ারিতে এক ধাপে কিছু পৌরসভা নির্বাচন আয়োজন করা যায় কি না, সেটি বিবেচনায় রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।
ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচনের পর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নির্বাচনী কার্যক্রম চলতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে জাতিসংঘের নির্বাচনবিষয়ক প্রকল্পের আয়োজনে অনুষ্ঠিত লিঙ্গসমতা বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী ভোটারের অংশগ্রহণ বেশি হলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
তাঁর মতে, এর পেছনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতা বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো প্রার্থীদের স্থানীয় পরিচিতি। প্রার্থী ও ভোটারের সরাসরি সামাজিক যোগাযোগ থাকায় প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য প্রার্থীরা ব্যাপক তৎপরতা চালান।
কিন্তু একই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। ফলে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্বে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা একটি আলাদা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে পারে।
জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম ধাপ, চতুর্থ সপ্তাহে দ্বিতীয় ধাপ এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তৃতীয় ধাপের ভোট আয়োজনের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তিন ধাপ মিলিয়ে ২ হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে এগুলো এখনো সম্ভাব্য সময়সূচি। চূড়ান্ত তফসিল, কোন ইউনিয়ন কোন ধাপে যাবে, নিরাপত্তা বাহিনী কীভাবে মোতায়েন হবে এবং পৌরসভা নির্বাচন একই সময়ের মধ্যে রাখা হবে কি না—এসব সিদ্ধান্ত কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই নিশ্চিত হবে।
অর্থাৎ রমজানের আগে তিন ধাপে ইউপি নির্বাচন করার প্রস্তুতি স্পষ্ট হলেও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষা চূড়ান্ত তফসিলের।

